শাহ্ তানভীর আহমেদ।
দেশব্যাপী চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় কার্যক্রম জোরদার করতে দেশের সব বিপণিবিতান, শপিং মল ও দোকানপাট আবারও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। একই সঙ্গে সব ধরনের বিলবোর্ডের আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার (১ জুন) বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে দেশের সব সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হলেও খুলনায় এর কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। বিভাগীয় শহর খুলনার বিপণিবিতান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি এই আদেশ পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের আদেশে বলা হয়, এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল। তবে সদ্য সমাপ্ত পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে সাময়িকভাবে সেই সময়সীমা বৃদ্ধি করে রাত ১০টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ঈদ উপলক্ষে দেওয়া সেই বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১ জুন থেকে আবারও আগের কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে রাত ১০টার পরিবর্তে সব বিপণিবিতান ও দোকানকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শেষ করতে হবে।

আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সব ধরনের বিলবোর্ডের বাতি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একই সময়সীমা দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এই নির্দেশনাটি মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
খুলনার মাঠপর্যায়ের চিত্র: সরকারি এই নির্দেশনা জারির পর দুদিন অতিবাহিত হলেও খুলনা মহানগরী ও এর আশপাশের জেলা-উপজেলাগুলোতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে খুলনা নগরীর অভিজাত শপিং মল থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানপাটেও আগের মতোই গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে দেখা গেছে। নগরীর ডাকবাংলো মোড়, পিকচার প্যালেস, কেডিএ নিউ মার্কেট, জলিল টাওয়ার, মজিদ সরণি, শিববাড়ী মোড় ও দৌলতপুরসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে দেদারসে কেনাবেচা চলছে। শপিং মল ও শো-রুমগুলোতে এসি এবং অতিরিক্ত আলোকসজ্জা ব্যবহারেও কোনো সাশ্রয়ী মনোভাব দেখা যায়নি।
একই অবস্থা বিরাজ করছে নগরীর বড় বড় বিলবোর্ডগুলোর ক্ষেত্রেও। সন্ধ্যা ৭টা পার হওয়ার পরও মোড়ে মোড়ে থাকা ডিজিটাল ও সাধারণ বিলবোর্ডগুলো নিয়ন আলোয় জ্বলজ্বল করছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত বিভিন্ন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও গভীর রাত পর্যন্ত চলছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য: এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী নেতা জানান, সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অবাস্তব। দুপুরের পর মূলত সন্ধ্যার পর থেকেই ক্রেতাদের সমাগম বাড়ে। ৭টায় বন্ধ করে দিলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের স্বার্থে তারা অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা কমিয়ে আনার পক্ষে মত দেন।
সচেতন মহলের ক্ষোভ ও প্রশাসনের ভূমিকা: এদিকে, তীব্র গরমে খুলনাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে যখন লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন সরকারের এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত খুলনায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের মতে, একদিকে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে, অন্যদিকে শপিং মল আর বিলবোর্ডে দেদারসে বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রশাসন যদি দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও নজরদারি জোরদার না করে, তবে সরকারের এই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মহৎ উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।











































