Home আঞ্চলিক খুবির বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণা: কয়রা উপজেলার ৯৭ ভাগ পরিবার জলবায়ু ঝুঁকিতে

খুবির বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণা: কয়রা উপজেলার ৯৭ ভাগ পরিবার জলবায়ু ঝুঁকিতে

11

স্টাফ রিপোর্টার।।

লিঙ্গ ˆবষম্য ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় গভীর সংকট # দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

খুলনার কয়রা উপজেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের কারণে প্রায় পুরো কমিউনিটি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে| ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার প্রভাবে ৯৭ শতাংশ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে| একই সঙ্গে দুর্বল অবকাঠামো, লিঙ্গ ˆবষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে|

বেসরকারি সংস্থা জাগ্রতা যুব সংঘ (জেজেএস) ও জাপানের শাপলা নীড়ের এবং জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত প্রস্তুতি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত কমিউনিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (সিআরএ) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে|

গত বুধবার(৮ এপ্রিল) সকালে নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত মিডিয়া সংলাপের মাধ্যমে এ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়| খুলনা জেলার কয়রা এলাকার নারী ও মেয়েদের দুর্যোগ ঝুঁকি বিষয়ে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন বিষয়ক এ সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন ও প্রভাষক মোঃ রিমু মিয়া|

জেজেএস’র সময়কারী(পরিল্পনা) নাজমুল হুদার সঞ্চালনায় এসময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন, খুলনা প্রেসক্লাবের আহবায়ক এনামুল হক, সদস্য সচিব রফিউল ইসলাম টুটুল, সাংবাদিক এইচ এম আলাউদ্দিন, মাকসুদ আলী, মোঃ নূরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু, আশরাফুল ইসলাম নূর, শেখ আল এহসান, দিপংকর রায়, আয়শা আক্তার জ্যোতি প্রমুখ| সংলাপে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বেশি করে গাছ লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়|

এসময় গবেষনার ফলাফল সম্পর্কে বলা হয়, ’খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল মিশ্র-পদ্ধতিতে এ গবেষনাটি পরিচালনা করে| গবেষণায় কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী ও সদর ইউনিয়নের ৩৮৩টি পরিবারের ওপর জরিপ চালায়| পাশাপাশি ১২টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা (এফজিডি) এবং ১২টি কী ইনফরমেন্ট সাক্ষাৎকার (কেআইআই) গ্রহণ করা হয়| স্থানিক তথ্য ও জিপিএস কোঅর্ডিনেট ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয় এবং ৬০টি সূচকের ভিত্তিতে কমিউনিটি ও ইউনিয়ন ভলনারেবিলিটি ইনডেক্স (ঈঠও ও টঠও) ˆতরি করা হয়|’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ’কয়রার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লবণাক্ততা (৮৪.৯%) ও ঘূর্ণিঝড় (৭৪.৭%)| বিশেষ করে মে ও নভেম্বর মাসে এই ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে|’

গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মানুষ এখনো কাঁচা ঘরে বসবাস করে এবং ৬০.৩ শতাংশ ঘরের উঁচু ভিত্তি নেই, যা বন্যার সময় বড় ঝুঁকি ˆতরি করে| দুর্যোগের পর ৮২.৮ শতাংশ মানুষ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে, ফলে জরুরি সহায়তা পেতে বিল¤^ হয়| লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকিও প্রকটভাবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে| ৮৯.৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সাইক্লোন শেল্টারে নারীদের জন্য নিরাপদ ও আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই| এতে হয়রানির আশঙ্কায় অনেক নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন| দুর্যোগের এক সপ্তাহের মধ্যেই ২৫ শতাংশ পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে| জীবিকা হারিয়ে ৭৫ শতাংশ পরিবার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার বড় অংশই উচ্চ সুদের ঋণ|

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৭৫.৭ শতাংশ মানুষ ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি (টউগঈ) সম্পর্কে জানেন না, যা দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়| ইউনিয়ন ভলনারেবিলিটি ইনডেক্স (টঠও) অনুযায়ী, দক্ষিণ বেদকাশী (৪৭.২৪) সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে| তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে রয়েছে কয়রা সদর (৩৮.৭৪)|

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়রার এই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন| জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বনায়ন, লবণমুক্ত পানি সরবরাহ, নারী-সংবেদনশীল আশ্রয়কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ভিত্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| এছাড়া ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় করা, নিয়মিত জনসম্পৃক্ত সভা আয়োজন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে| বিশেষজ্ঞদের মতে, সমšি^ত ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে কয়রার মানুষের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি আরও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিতে পারে|