Home সম্পাদকীয় ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ইন্তেকাল: প্রকৃত বীরের বিদায়

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ইন্তেকাল: প্রকৃত বীরের বিদায়

21

চলে গেলেন দেশের একজন একনিষ্ঠ সেবক। বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের কিভাবে কল্যাণ হবে সেই চিন্তার বাইরে অন্য কোনো ভাবনা তার মনে কখনো স্থান পায়নি। একেবারে ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুর মুহূর্তেও একই চিন্তা ছিল তার সঙ্গী। শেষ মুহূর্তে জীবন বাঁচাতে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও দেশের প্রতি তার আনুগত্য ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট।
বিলাতে ডাক্তারি পড়া শেষ না করে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। আগরতলায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে গড়ে তোলেন ৪৮০ শয্যার ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। সেখানে রোগীদের সেবার জন্য অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেন। সাধারণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োগের এ পদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেটে’ প্রকাশিত হয়। এর পর থেকে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ধারণাটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। ১৯৮২ সালের ওষুধনীতি যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চালু করেছিলেন, সেটি দেশকে ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে, ওই নীতি প্রণয়নের অন্যতম কারিগর ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বহির্বিশ্বে তার পরিচয় বিকল্প ধারার স্বাস্থ্য আন্দোলনের সমর্থক ও সংগঠক হিসেবে।
শুধু নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সব ধরনের কাজে তাদের অংশগ্রহণ যে সম্ভব সেটি হাতে-কলমে দেখিয়েছেন ডা: জাফরুল্লাহ। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন বিভাগের উচ্চপদ থেকে শুরু করে গাড়িচালক, এমনকি কার্পেন্টার পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেখার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়া বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। এ কেন্দ্রে যে মূল্যে মানুষকে চিকিৎসা দেয়া হয় সেটি অবিশ^াস্য রকমের কম। দেশে চিকিৎসাসেবা যখন অত্যধিক মুনাফা অর্জনের ব্যবসায় পরিণত সেই সময়ে এ দৃষ্টান্ত বিরলতম। স্বাভাবিকভাবে তিনি গরিবের ডাক্তার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
ডা: জাফরুল্লাহ যেসব কাজ করেছেন তার প্রত্যেকটির জন্য হয়তো আলাদা করে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সহজ সরল জীবনযাপনে তার নিজের চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে ছিলেন নির্মোহ। নিজের প্রকল্পগুলো লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার কথা কখনো ভাবেননি। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা পুরস্কারবিজয়ী। পেয়েছেন র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, সুইডেনের বিকল্প নোবেলখ্যাত রাইট লাইভলিহুড ও আরো অনেক পুরস্কার।
কিন্তু দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণকামী হিসেবে তার যে সামাজিক রাজনৈতিক ভূমিকা সেটি সবচেয়ে বড়। তিনি যা বিশ^াস করতেন অকুণ্ঠচিত্তে তা জোরগলায় প্রকাশ করতেন। কারো মন জুগিয়ে কথা বলতেন না। এটি তার সততার অন্যতম দৃষ্টান্ত। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে চিন্তা ও কর্মের পাশাপাশি দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিরোধ কমিয়ে এনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টার জন্যও প্রশংসিত হয়েছেন। আর সে জন্য মৃত্যুর পর শুধু নয়; বরং বেঁচে থাকতে পেয়েছেন আপামর জনগণের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আচরণে মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে দলীয় গুণ্ডারা, মাছ চুরির মতো মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হয়েছে। কিন্তু তিনি মুখ ফিরিয়ে নেননি। যখনই দরকার মনে করেছেন সরকারের উদ্দেশে যথাযথ পরামর্শ বা আহ্বান ঠিকই জানিয়েছেন।
তার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত করোনা টেস্ট কিট নিয়েও সরকারের হীনম্মন্যতার শিকার হন তিনি। সেটি আমাদের জাতিগত দুর্ভাগ্য। কারণ, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো একজন মহৎপ্রাণ মানুষের যথাযথ মর্যাদা বুঝে ওঠার মতো যোগ্যতা আমাদের অনেকের নেই। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় সন্তপ্রতিম এ মানুষটির পারলৌকিক মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করছি।