বাগেরহাটের কচুয়ায় আট বছর বয়সী এক অবোধ মাদ্রাসাশিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে সালিসের নামে যে ন্যক্কারজনক প্রহসন ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তা শুধু বেআইনিই নয়, বরং চরম অমানবিক। একটি স্বাধীন, সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা একটি অমিমাংসাযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এর বিচার কেবল আদালতেই হতে পারে; কোনো গ্রাম্য সালিস বা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নয়। অথচ আমরা চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করলাম, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা আরিফ হুসাইন এবং ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমানের নেতৃত্বে শত শত মানুষের সামনে ওই ট্রমাটাইজড শিশুটির জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এটি শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শামিল। মাত্র ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে একটি শিশুর সম্ভ্রমের রফাদফা করার যে ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে, তা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার দম্ভ ও নৈতিক অবক্ষয়কেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এই বেআইনি সালিস ও আপস-মীমাংসার নেপথ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও প্রভাবশালী শিল্পপতি সরদার জাহিদের ‘নিয়ন্ত্রণ ও গ্রিন সিগন্যাল’ থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। যদিও তিনি দাবি করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে হেয় করতে এটি করছে, কিন্তু তাঁর অনুসারীরা যেভাবে প্রকাশ্যে ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করেছে এবং সালিসের আয়োজন করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, তাতে তাঁর নৈতিক দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতা বা অর্থবল কখনোই কোনো জঘন্য অপরাধীকে রক্ষার ঢাল হতে পারে না।
এই ঘটনার সবচেয়ে হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক দিক হলো স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা। প্রকাশ্য সালিস ও হট্টগোলের খবর আগে থেকে জানা সত্ত্বেও পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ‘লিখিত অভিযোগ নেই’—থানার পরিদর্শকের এমন দায়সারা বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্বকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা মূলত প্রভাবশালীদেরই পরোক্ষভাবে মদদ জুগিয়েছে।
বর্তমানে চরম মানসিক ট্রমা ও লোকলজ্জায় শিশুটির শিক্ষাজীবন থমকে গেছে। গরিব ও অসহায় পরিবারটি প্রভাবশালীদের হুমকিতে আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, অপরাধী ও তাদের মদদদাতারা সামাজিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
অবিলম্বে অভিযুক্ত হাকিম সরদার এবং বেআইনি সালিস আয়োজনকারী, মামলা থেকে নিবৃত্তকারী ও এর নেপথ্যের গডফাদারদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোর দাবি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজে এমন জঘন্য অপরাধের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।










































