শামিম শিকদার,বাগেরহাট থেকে ফিরে।।
বাগেরহাটের কচুয়ায় আট বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিশুকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই জঘন্য অপরাধের ঘটনাকে আইনি পথে যেতে না দিয়ে স্থানীয়ভাবে ধামাচাপা দিতে এক সালিস বৈঠকের আয়োজন করা হয়। যেখানে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মানফুজুর রহমান শত শত মানুষের সামনে ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দি নেন। তবে এই সালিস ও আপস-মীমাংসার পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও প্রভাবশালী শিল্পপতি সরদার জাহিদের ‘নিয়ন্ত্রণ ও গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোরালো গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে সালিস চলাকালে দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল ও সংঘর্ষ বাঁধলে বিচার প্রক্রিয়া পণ্ড হয়ে যায়।
সবকিছুই ‘জাহিদ ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে’: অভিযুক্তকে বাঁচানোর নেপথ্য কারিগর কারা? অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত শনিবার মাদ্রাসার টিফিনের বিরতিতে খাবার কিনতে গিয়ে স্থানীয় দোকানি হাকিম সরদারের হাতে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয় ওই শিশু। ঘটনাটি জানাজানির পর আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. আরিফ হুসাইন উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শে সালিসের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার তোড়জোড় শুরু করেন। ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা না করার জন্য চাপ দিয়ে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি রফাদফা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এই মধ্যস্থতার পেছনে কার প্রভাব কাজ করছে—জানতে চাইলে বিএনপি নেতা আরিফ হুসাইন অকপটে স্বীকার করেন, “এখানে সব সরদার জাহিদ ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। জাহিদ ভাই এখন শুধু উপজেলার সভাপতি না, তিনি বড় শিল্পপতি। তাঁর সাহায্য পায়নি এমন ঘর নেই।” আরিফ হুসাইন আরও দাবি করেন, পরিবারটি মামলা করলে বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হবে এবং মেয়েটির বিয়েসাদি দিতে সমস্যা হবে, তাই ‘ঝামেলা না করে’ টাকা দিয়ে ফয়সালা করাই ভালো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামনে স্থানীয় সরকার ও ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং দলীয় প্রভাব ধরে রাখতে সরদার জাহিদের নাম ব্যবহার করে অপরাধীকে রক্ষার এই নোংরা মিশনে নেমেছিল তাঁর অনুসারীরা। এর মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের খেলা ঢুকে গেছে বলেও অনেকে দাবি করছেন।
অভিযোগ অস্বীকার ও সরদার জাহিদের সাফাই : তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে এই ঘটনার সাথে তাঁর নাম জড়িয়ে ‘মব’ করার চেষ্টা করছে। যোগাযোগ করা হলে সরদার জাহিদ বলেন, “সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমার নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ওই মাদ্রাসাটি আমরা পরিচালনা করি। একটি এতিমখানা ও মসজিদ আছে। এসব করে কি সামাজিকভাবে আমরা অপরাধ করেছি? এতে নিয়ন্ত্রণের কী আছে?” এদিকে সালিসকারী বিএনপি নেতা আরিফ হুসাইনের দাবি, সরদার জাহিদ যেহেতু আগামীতে উপজেলা নির্বাচন করবেন, তাই তাঁর বিরুদ্ধে লেখার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সাংবাদিকদের ‘লক্ষ লক্ষ টাকা’ দিয়ে পাঠিয়েছে। টাকা নিয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা মীমাংসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
সালিসের নামে মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও সংঘর্ষ : গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বসা ওই সালিস বৈঠকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষের সামনে ওই অবোধ শিশুর কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনছেন ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমান। একপর্যায়ে অভিযুক্ত হাকিম সরদার অপরাধ স্বীকার করে পা জড়িয়ে ধরলে উপস্থিত জনতা তাকে জুতার মালা পরাতে চায়। এতে অভিযুক্তের ছেলে হাসিব সরদার বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে লাঠিসোটা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে সালিস পণ্ড হয়। বর্তমানে এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ মিলেছে।
আতঙ্কে শিশু ও অসহায় পরিবার: ঘটনার পর থেকে লোকলজ্জা ও চরম মানসিক ট্রমার কারণে শিশুটির মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য জানান, “আমরা গরিব মানুষ। কী করব, কোথায় যাব? মামলা করতে চাচ্ছি; কিন্তু কী করব বুঝতেছি না। আরিফ মেম্বারসহ কয়েকজন ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছে।” পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা ধর্ষণচেষ্টার মতো একটি অমিমাংসাযোগ্য ফৌজদারি অপরাধে প্রকাশ্য সালিস ডাকার খবর আগে থেকেই পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ বিষয়ে কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রাশিদ দায়সারা বক্তব্য দিয়ে বলেন, পরিবারটি কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। সালিস ঠেকানোর ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই এবং সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া ওসি হয়তো ভালো বলতে পারতেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে প্রধান সালিসকারী ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমান এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আত্মগোপন করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং অর্থবলের জোরে যারা একটি শিশুর সম্ভ্রমের মূল্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে চেয়েছিল এবং এর নেপথ্যে থেকে যারা মদদ জুগিয়েছেন, সেই সরদার জাহিদ ও তাঁর অনুসারীসহ মূল গডফাদারদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক।











































