স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনায় এক কিশোরী গৃহকর্মীকে অমানুষিক নির্যাতন ও গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগে সোনাডাঙ্গা থানার কর্মরত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সঞ্জয় কুমার সাহা ও তার স্ত্রী এএসআই পরি রানী সাহাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে খুলনার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. ফারুক ইকবাল গ্রেপ্তারকৃত এই পুলিশ দম্পতিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিশোরীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও গুরুতর নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে।
ভিডিও ভাইরালের পর উদ্ধার, পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা: মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার সোলার পার্ক সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় ওই কিশোরী দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করে আসছিল। বিভিন্ন অজুহাতে তার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। গত বুধবার দুপুরে তরকারি পুড়ে যাওয়ার অজুহাতে গৃহকর্মীর ওপর চড়াও হন এএসআই সঞ্জয়ের স্ত্রী পরি রানী সাহা। তিনি মেয়েটিকে বেদম মারধর করার পাশাপাশি তার শরীরে গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা দেন।

পাশের ভবন থেকে এক সাংবাদিক পুরো নির্যাতনের ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার খবর পেয়ে বুধবার বিকেলেই সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে আসে এবং অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে থানা হেফাজতে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, হেফাজত থাকা অবস্থায়ও বুধবার থেকে এই পুলিশ দম্পতি গৃহকর্মী সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক রবিউল গাজী উজ্জ্বল জানান, “গতকাল বিকেলে খুলনা সোলার পার্কে একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার সময় পাশের ভবনের ভেতরে একজনকে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করতে দেখি। দূর থেকে পুরো ঘটনাটি আমি ক্যামেরায় রেকর্ড করি। পরে জানতে পারি, সামান্য তরকারি পুড়ে যাওয়ার কারণে ওই গৃহকর্মীকে মারধর ও গরম কড়াই দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে।”

মায়ের মামলা ও ক্ষুব্ধ মানবাধিকার কর্মী: খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার ভোরে নরসিংদী থেকে খুলনায় পৌঁছান ভুক্তভোগীর মা মিনতি রানী। তিনি বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি নির্যাতন মামলা দায়ের করেন। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তার মেয়ে ওই বাসায় কাজ করলেও তার ওপর এমন অমানবিক নির্যাতনের কথা তিনি জানতেন না। তিনি দ্রুত তার মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে চান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তারা দুজনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সদস্য। তাদের কাছ থেকে এ ধরনের মধ্যযুগীয় অপরাধ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সব ধরনের আইনি ও সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে।”
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগীর মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করে আসামিদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। একই সাথে এই অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।










































