সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।
টেরাকোটা ও সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যে সমৃদ্ধ সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’টি সংস্কার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন ও ৬০ ফুট উঁচু এই ত্রিতল নবরত্ন মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে এর ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির ফলক চিত্র (টেরাকোটা) এবং অবকাঠামো রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য:
সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার এবং কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া গ্রামে অবস্থান এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির। ৩৩ ফুট বাই ৩৩ ফুট আয়তনের এই নবরত্ন পিরামিড আকৃতির মন্দিরটির ভেতরের অংশ চার ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে চারপাশের ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ, দ্বিতীয় অংশে মণ্ডপ এবং তৃতীয় অংশে রয়েছে কোঠা ও প্রকোষ্ঠ। মূল মন্দিরের সাথে সংলগ্ন হিসেবে দুর্গা মন্দির ও শিবমন্দিরও রয়েছে। পূর্বদিকের অলিন্দ থেকে ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়ি এবং ছাদের ওপর ঊর্ধ্বমুখী গম্বুজবিশিষ্ট রত্ন রয়েছে। দেয়ালের শিলালিপি অনুযায়ী এটি ‘শ্যামসুন্দর নবরত্ন মন্দির’ নামে পরিচিত হলেও স্থানীয়ভাবে এটি ‘সোনাবাড়িয়া মঠ’ নামেও খ্যাত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও জনশ্রুতি:
ইতিহাস ও শিলালিপির তথ্য মতে, ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে হরিরাম দাস (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাস) এই নবরত্ন মন্দিরটি নির্মাণ করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে স্থানটি অত্যন্ত পবিত্র, কারণ জনশ্রুতি রয়েছে যে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব একসময় এই মন্দিরে টানা প্রায় দুই মাস অবস্থান করেছিলেন। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে এক রাতে জিন-ভূতেরা এই মন্দির তৈরি করেছিল বলেও লোককথা প্রচলিত রয়েছে।
দর্শনার্থীদের ভোগান্তি ও স্থানীয়দের উদ্বেগ:
দেশ-বিদেশের বহু তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থী প্রতিদিন এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি দেখতে আসলেও সেখানে সীমানা প্রাচীর, আবাসন ব্যবস্থা কিংবা খাবারের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। সেবাইত সুপ্রসাদ চৌধুরী ও দেব প্রসাদ চৌধুরী জানান, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনা রক্ষায় এখন দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ দরকার।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত জানান, “পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার পর সরকারি প্রতিনিধিরা ছবি তুলে নিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আর কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি। এমনকি ভারতে উপ-হাইকমিশনার পরিদর্শনের সময় একটি গেস্টহাউস নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানটির সুরক্ষায় দেবোত্তর সম্পত্তি ঘিরে দ্রুত সীমানা প্রাচীর দেওয়া আবশ্যক।”

পুনরুদ্ধারে জেলা পরিষদ প্রশাসকের আশ্বাস:
বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, “১৭৬৭ সালে নির্মিত এই অনন্য টেরাকোটা স্থাপত্যটি দেখতে প্রতিদিনই শত শত মানুষ আসেন। কিন্তু এখানে দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জায়গা বা প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নেই।” ঐতিহ্যবাহী এই পুরাকীর্তি সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি।
স্থাপত্যশৈলী, ইতিহাস ও ধর্মীয় অনুভূতির এই অনন্য স্মারকটি রক্ষায় সরকারি ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অতিসত্বর কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ঐতিহ্যপ্রেমী সচেতন মহল।











































