সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে যোগাযোগ, ঝটিকা মিছিল; আত্মগোপনে নেতারা, সংকটে পরিবার
রকিবুল ইসলাম মতি।।
খুলনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে ফের যোগাযোগ বাড়ানোর তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ না থাকায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরোনো যোগাযোগ ধরে রাখা এবং বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি। আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এ তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। নগরীর বিভিন্ন ক্লাব, ক্রীড়া ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, পাড়া-মহল্লার সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে ব্যক্তিগত পরিচয় ও সম্পর্ক বজায় রাখছেন কেউ কেউ। তবে এসব কর্মকাণ্ডের সবকিছুকে রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামাজিক পরিসরে অংশগ্রহণের আড়ালে সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নগরীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনা এ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর নগরীর শিববাড়ী মোড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে দুজনকে আটক করে পুলিশ। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর খালিশপুর এলাকায় জুমার নামাজের সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি মিছিল বের হলে পুলিশ ও স্থানীয়দের ধাওয়ায় সেটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অল্প সময়ের মধ্যে স্থান ত্যাগ করায় তাদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোও নগরীতে বিক্ষোভ ও সতর্কতামূলক কর্মসূচি পালন করছে। তবে তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মী সামাজিক পরিসরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতাদের বড় একটি অংশ এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
আত্মগোপনে নেতারা, চাপে পরিবার: দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর পরিবার আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছে বলে জানা গেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাড়িতে না থাকায় ভরণ-পোষণ, সন্তানের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককে। মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারার প্রভাব পড়ছে পরিবারের সদস্যদের ওপরও।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সালিশ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতা চাইছেন। কোনো কোনো বিএনপি নেতা রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে গিয়ে মানবিক বিবেচনায় এসব সমস্যা সমাধানে সহায়তা করছেন বলেও জানা গেছে। তবে এ ধরনের ঘটনা কতটা বিস্তৃত, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না। তাদের দাবি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চলছে। তাদের একজন বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। এ কারণে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান: খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সভা, মিছিল কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জেলা বিএনপি সতর্ক রয়েছে। যেকোনো ধরনের নৈরাজ্য ঠেকাতে দল রাজপথে রয়েছে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে তা নজরে রাখা প্রয়োজন। মহানগর বিএনপি এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। তবে কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় বানানো উচিত নয়।
খুলনার পুলিশ সুপার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা ঠেকাতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন প্রকাশ্যে বা গোপনে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করলে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের আড়ালে উসকানিমূলক তৎপরতা বা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
যোগাযোগ কতটা সংগঠিত, উঠছে প্রশ্ন: খুলনার এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ টিকে থাকতে পারে। তবে সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া আর রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা এক বিষয় নয়। অন্যদিকে, ঝটিকা মিছিলের মতো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটলে তা রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে খুলনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর সামাজিক পরিসরে দৃশ্যমানতা, বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিল এবং ডিসেম্বরকে ঘিরে যোগাযোগ বাড়ানোর অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এসব তৎপরতা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ, নাকি এর পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা রয়েছে-তা স্পষ্ট করতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ ও পারিবারিক সমস্যাকে এক করে না দেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।











































