Home Lead ৩০ গ্যাংয়ের দুই’শ কিশোর অপরাধীর হাতে জিম্মি খুলনা

৩০ গ্যাংয়ের দুই’শ কিশোর অপরাধীর হাতে জিম্মি খুলনা

188


সৈয়দ হুমায়ূন কবীর।।

খুলনা মহানগরী ও জেলাজুড়ে ডালপালা মেলেছে ভয়ঙ্কর ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার। রূপসা থেকে দৌলতপুর—গোটা খুলনা এখন প্রায় ৩০টি কিশোর গ্যাংয়ের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি গ্রুপ এতটাই বেপরোয়া যে, এদের দুই শতাধিক দুর্ধর্ষ ও অস্ত্রধারী সদস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে নগরীর অপরাধ সাম্রাজ্য। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ ঘটিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই কিশোর অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠপর্যায়ের চরম নিষ্ক্রিয়তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে শান্তির শহর খুলনা এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নগরী।


১০ গ্রুপের হাতে জিম্মি খুলনা, জামিনে ফিরেই দ্বিগুণ হিংস্র : অনুসন্ধানে ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি তালিকা না থাকলেও গোয়েন্দাদের অভ্যন্তরীণ তথ্যমতে ৩০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও তৎপর গ্যাংগুলো হলো— ‘গোল্ডেন বয়েজ’, ‘ডেঞ্জার বয়েজ’, ‘টাইগার টিম’, ‘কিং অব রূপসা’ এবং দৌলতপুরের সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপ। গত দুই বছরে এই বাহিনীর সদস্যদের হাতে অন্তত শতাধিক ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।


পুলিশ ও র্যাব-৬ এর অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও আইনি ফাঁকফোকরে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে। আর জামিনে ফিরেই তারা মেতে উঠছে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের হিংস্র খেলায়।


প্রাণ বাঁচাতে চারতলা থেকে লাফ, রাজপথ এখন অপরাধের অভয়ারণ্য: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ মিলছে নগরীর সাম্প্রতিক কিছু লোমহর্ষক ঘটনায়। খালিশপুরে ‘আর জে রাফি’ নামক একটি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে সৌরভ নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী চারতলা ভবন থেকে লাফ দিয়ে গুরুতর আহত হন, যিনি বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। এছাড়া নিরালা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের প্রকাশ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ স্থানীয়দের মাঝে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, গ্যাংগুলোর অত্যাচারে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতেও সাহস পাচ্ছেন না।


খুলনার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও গ্যাংয়ের আদ্যোপান্ত : কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো: রাশিদুল ইসলাম জানান, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১২টি গ্যাং অত্যন্ত তৎপর, যার শিকার হচ্ছে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোররা। ইতোমধ্যেই ‘টিপসি’, ‘ডেঞ্জার’ ও ‘গোল্ডেন বয়েজ’ নামের তিনটি গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজিন হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া ৪ জনই ডেঞ্জার ও গোল্ডেন গ্যাংয়ের সদস্য।


গোয়েন্দা সূত্র মতে, বয়রা ও বৈকালী এলাকা থেকে পরিচালিত ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ গ্রুপের সদস্যরা মূলত বস্তি এলাকার এবং এরা ছিনতাই, মাদক ও হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত। অন্যদিকে স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন বয়েজ’ এবং বয়রা পালপাড়া থেকে পরিচালিত ‘টিপসি গ্রুপ’ রিকশা গ্যারেজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে।


পুলিশের ‘রক্ষকই ভক্ষক’ ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ: খুলনায় ডিবির (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অপরাধীদের সাথে সখ্যতার বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “খুলনায় দীর্ঘদিন যাবত পুলিশ প্রশাসনের কোনো জনবান্ধব তৎপরতা নেই। তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম এখন সম্পূর্ণ নাজুক ও ব্যর্থ। কোনো অপরাধ ঘটার পর সাধারণ মানুষ যেভাবে জানে, পুলিশও সেভাবে জানে; আগে থেকে তাদের কাছে কোনো তথ্য থাকে না। এটা চরম অদক্ষতা। উল্টো ডিবির ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা এই অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।”


রাজনৈতিক শেল্টারের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন কর্তারাও। খুলনার পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরে জেলে পাঠানো হলেও তারা জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধ করছে। এদের নেপথ্যে একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন, যারা এদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। আশ্রয়দাতাদের তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অপরাধী ও তাদের গডফাদারদের নির্মূলে একাধিক টিম কাজ করছে।” সম্প্রতি লবনচরার স্লুইসগেট এলাকার শাহীন হাওলাদার, শফিকুল ইসলাম অপু, পলাশ হাওলাদার, রিমন, হৃদয় শেখ, মিরাজুল ইসলাম রাতুল, রাতুল ইসলাম জিসান, মৃদুল হাসান তনু, ফেরদৌস গাজীসহ প্রায় অর্ধশত কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।


অন্যদিকে, খুলনা জেলার পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও থানাগুলোর তৎপরতা নিয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো: তাজুল ইসলাম বলেন, “জেলার কয়েকটি থানায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। আমরা বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি। গডফাদারদের তালিকাও তৈরি, এখন শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছি; গ্রিন সিগন্যাল পেলেই অভিযান শুরু হবে।”


জনগণের দাবি: শুধু চুনোপুঁটি নয়, ধরা হোক গডফাদারদের: খুলনাবাসীর মতে, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ যদি আন্তরিক না হয়, তবে এই কিশোর গ্যাং কালচার চিরতরে বন্ধ করা অসম্ভব। লোকদেখানো দু-চারজন কিশোরকে গ্রেপ্তার না করে, যেসকল রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ এবং পুলিশের অসাধু কর্মকর্তা এদের অস্ত্র ও অর্থের জোগান দিচ্ছে, তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নগরবাসী।