ঢাকা অফিস।।
জুলাই যোদ্ধা ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করতে ‘উদ্যোগ’ নামে নতুন ঋণ প্রকল্প চালুর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের তহবিল ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উৎসের অর্থ যুক্ত করে প্যাকেজটির আকার ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই তহবিলের আওতায় কোনো জামানত ছাড়াই মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন তরুণরা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে নতুন এ ঋণ প্রকল্পের কাঠামো, তহবিলের আকার, ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য ঋণ বিতরণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের সব ব্যাংককে এ প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি চালু হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকদের। তাদের ব্যবসা বা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার লক্ষ্যেই সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্পের আওতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ভালো পারফরম্যান্স করা উদ্যোক্তাদের অনুদান বা গ্রান্ট দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খান এবং এনসিসি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির আনাম খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের বিষয়ে শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এরপর ব্যাংকগুলো প্রকল্পের আওতায় ঋণ বিতরণ শুরু করবে।
বৈঠকের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাংকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধায় তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ঋণের সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ ঋণ নতুন উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ইতিমধ্যে ব্যবসা করছেন—এমন তরুণদেরও দেওয়া হতে পারে। তবে ব্যবসাটি নতুন হতে হবে, নাকি কমপক্ষে এক বছর ধরে চলমান ব্যবসাগুলোও এ সুবিধার আওতায় আসবে—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো পরিকল্পনাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে ঋণের পরিমাণ, সুদের হার, যোগ্যতা, ব্যবসার মেয়াদ এবং অন্যান্য শর্ত চূড়ান্ত করা হবে।
‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের অন্যতম বিশেষ দিক হতে পারে ঋণের পাশাপাশি ভালো পারফরম্যান্স করা উদ্যোক্তাদের অনুদান বা গ্রান্ট দেওয়ার ব্যবস্থা। যেমন, কোনো উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলে পরবর্তী সময়ে তার ব্যবসার অগ্রগতি, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও সার্বিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় আরও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রান্ট দেওয়ার সুযোগ রাখা হতে পারে।
তবে গ্রান্টের অর্থ একবারে দেওয়া হবে, নাকি উদ্যোক্তার ব্যবসার অগ্রগতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেওয়া হবে—এ বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রান্টের অর্থের একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে ব্যাংকগুলোর করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) তহবিলের কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সিএসআর তহবিলের একটি অংশ তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হবে এমন তরুণদের চিহ্নিত করা, যাদের ব্যবসা করার আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে তারা এগোতে পারছেন না। উদ্যোক্তা ট্রেডিং ব্যবসা করুন, পণ্য উৎপাদন করুন, ফিশারিজের সঙ্গে যুক্ত থাকুন, ঘরে খাবার তৈরি করে বিক্রি করুন কিংবা সতরঞ্জি ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করুন—ব্যবসার ধরনকে খুব বেশি সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন। কারণ ঋণের অর্থ যেন প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের হাতে যায় এবং উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হয়—এটাই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সারা দেশের উপজেলা পর্যায় থেকে উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপকদের সম্পৃক্ত করে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ স্থানীয় ব্যাংকাররা এলাকার কোন তরুণ কী ধরনের ব্যবসা করছেন বা ব্যবসা শুরুর চেষ্টা করছেন, সে বিষয়ে তুলনামূলক ভালো ধারণা রাখেন।
এ জন্য উপজেলা ধরে ধরে ব্যাংকগুলোকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। কোন ব্যাংক কোন উপজেলায় কাজ করবে এবং কোন ব্যাংক কতজন উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করবে—এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে।
আবেদন প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই ও অর্থায়নের বিস্তারিত কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে উদ্যোক্তা নির্বাচনকে পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের মোট আকার এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। প্রাথমিকভাবে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়ার একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা চলছে। সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা করে ঋণ দেওয়া হলে এর মাধ্যমে কয়েক হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অনুদানের অর্থ যুক্ত হতে পারে। ফলে ঋণ ও গ্রান্ট মিলিয়ে পুরো প্যাকেজের আকার আরও বড় হতে পারে। তবে মোট কত টাকা ঋণ এবং কত টাকা গ্রান্ট হিসেবে দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে—২৮ বছরের কম বয়সী তরুণ উদ্যোক্তাকে বাছাই করে অর্থায়ন করা। এর মাধ্যমে কয়েক হাজার তরুণকে উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।










































