Home আঞ্চলিক বকুলের হাতে জিম্মি শৈলকুপা হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা

বকুলের হাতে জিম্মি শৈলকুপা হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা

6


খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ


জরুরি চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেই অ্যাম্বুলেন্স সেবাই যেন পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে। বছরের পর বছর ধরে চালক বকুল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ এখন জনমনে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।


গত ৩ জুনের একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেদিন শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বারইপাড়া গ্রামের শেখ মো. আবু জাফর কুসুম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করেন।
এরপর রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি চাইলে চালক বকুল মিয়া গাড়িতে জ্বালানি তেল না থাকার অজুহাতে যেতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে রোগীর নিরুপায় স্বজনরা নিজেদের টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় তেলের ব্যবস্থা করলেও চালক বকুল সাফ জানিয়ে দেন— তিনি কোনোভাবেই ভাড়ায় যাবেন না।


সরকারি গাড়ি সচল থাকা সত্ত্বেও চালকের একগুঁয়েমি এবং হাসপাতাল চত্বরে দীর্ঘক্ষণ কালক্ষেপণের কারণে কোনো চিকিৎসা না পেয়ে একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অসুস্থ আবু জাফর কুসুম।


পরিবারটির অভিযোগ, দীর্ঘ বিলম্বের কারণে রোগীকে সময়মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়।
রোগীর ভাতিজা উল্লাস হোসাইন বলেন, ‘আমরা তেলের টাকা দিতে চেয়েছি, চালককে অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই গাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হননি। এরপর বিকল্প ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ার কারণে উন্নত চিকিৎসা পেতে দেরি হয়। হাসপাতালেই ছটফট করতে করতে আমার কাকা মারা গেছেন।’


এ ঘটনায় শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে শৈলকুপা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে পুলিশ হাসপাতাল থেকে বকুল হোসেনকে আটক করে।


পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বে অবহেলা ও সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ৩০৪,৩০৪(ক), ১৬৬ ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। তদন্ত চলছে। বকুল বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে।


এছাড়াও চালক বকুল হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের বাইরে নিতে হলে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকের অনুমতি এবং অফিশিয়াল রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক।
তবে প্রভাবশালী এই চালক নিজে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তার নিজস্ব নিয়োজিত এক বহিরাগত যুবককে দিয়ে গোপনে কুষ্টিয়া রুটে অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়ায় ব্যবহার করেন তিনি।


এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল-খয়েরি শার্ট পরা এক যুবকের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই যুবক চালক বকুলের আত্মীয় এবং হাসপাতালের কেউ নন। হাসপাতালের কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই দাপটের সঙ্গে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত ব্যবসায় রূপান্তর করেছিলেন ওই চালক।


স্থানীয়দের অভিযোগ, চালক বকুল মিয়া সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে রোগীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া হাতিয়ে নিতেন।
শুধু এই অভিযোগই নয়, দায়িত্বে অবহেলা, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, পরিচিত রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স না দেওয়া, মিথ্যা অজুহাতে সেবা থেকে বঞ্চিত করা-তার বিরুদ্ধে এমন নানা অভিযোগ বহুদিনের।


স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা কার্যত একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ জরুরি মুহূর্তেও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতাল এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘদিন ধরেই বকুল হোসেন ও তার পরিবারের প্রভাব রয়েছে। রোগী নেওয়া হবে কি হবে না, কখন যাবে, কত ভাড়া নেওয়া হবে-এসব বিষয়ে প্রায়ই অভিযোগ উঠেছে।


শৈলকুপার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘সরকারি অ্যাম্বুলেন্স হওয়ার কথা জনগণের জন্য। কিন্তু এখানে মনে হয় ব্যক্তিগত গাড়ির মতো পরিচালিত হয়। কারো সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হলে একরকম,না হলে আরেক রকম আচরণ করা হয়।’
আরেক ভুক্তভোগী রানা হাসান বলেন,‘আমার আত্মীয়কে কুষ্টিয়ায় নিতে হয়েছিল। সরকারি ভাড়া হিসেবে যে টাকা নেওয়া হলো, তা শুনে আমরা হতবাক। রোগীর অবস্থা খারাপ থাকায় তখন কিছু বলতেও পারিনি।’


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পরিচিত কিংবা এলাকার মানুষদের ক্ষেত্রে প্রায়ই নানা অজুহাত দেখানো হয়। কখনো বলা হয় গাড়িতে তেল নেই, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলা হয়, আবার কখনো চালক পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়। পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করতে পারেন না দেখে এমন কৌশল খাঁটান বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।


ভুক্তভোগী বসির আহমেদ বলেন,‘গাড়ি নষ্ট বলে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি সেই গাড়িই অন্য রোগী নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেছে।’
মাসুদ মোল্লা নামে আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন,‘যাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ নেই, তাদের ক্ষেত্রেই বেশি সমস্যা হয়। পরিচিত মানুষ হলে উল্টো নানা অজুহাত দেখানো হয়।’


এদিকে করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে যখন অনেকেই রোগী পরিবহনে ভয় পাচ্ছিলেন, তখন স্বপন নামে এক ব্যক্তি মানবিক কারণে রোগী পরিবহনের দায়িত্ব পালন করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুপারিশে তিনি খণ্ডকালীনভাবে অ্যাম্বুলেন্স চালকের দায়িত্ব পান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিরোধের মুখে পড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, বকুল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি হামলার শিকার হন। এতে তার একটি হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


ভুক্তভোগী স্বপন বলেন, ‘করোনার সময় মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করেছি। কিন্তু এমনভাবে আমাকে মারধর করা হয়েছে যে আজও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছি না। হামলার ঘটনার পর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছি। যা এখন চলমান রয়েছে।’
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, অতীতে হাসপাতালের কিছু বেড হাসপাতাল থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার ও বিক্রির অভিযোগেও তদন্ত হয়েছিল। যদিও সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে আসেনি। এছাড়া রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে একাধিকবার প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল বলে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে থাকায় কোনো ব্যবস্থাই স্থায়ী হয়নি।


স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শুধু একটি ঘটনা নয়; বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগগুলোরও তদন্ত প্রয়োজন। শৈলকুপার এক প্রবীণ নাগরিক সোবহান হোসেন বলেন,‘একজন চালকের বিরুদ্ধে যদি বছরের পর বছর একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শুধু ব্যক্তিকে নয়,পুরো ব্যবস্থাপনাকেই তদন্ত করতে হবে।’
ফজলুর রহমান নামে একজন বলেন, ‘সরকারি অ্যাম্বুলেন্স মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। সেখানে যদি রোগীর পরিবারকে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’
সচেতন মহলের দাবি, অ্যাম্বুলেন্স সেবায় স্বচ্ছতা আনতে ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, কল রেজিস্টার সংরক্ষণ, জিপিএস মনিটরিং এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি অতীতের সব অভিযোগ খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


এ বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন বলেন, ‘বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে তাকে একাধিকবার শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। তবে সেসব কর্মস্থলেও দায়িত্বে অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হন। পরে অজ্ঞাত প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবারও শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিরে আসেন।


তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি দায়িত্বে অবহেলা এবং জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনায় শেখ মো. আবু জাফর কুসুম (৬৫) নামে এক মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিতভাবে অভিযোগ পাঠিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো অধিদপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’