খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
দেশের বন্ধ থাকা সব বস্ত্র ও পাটকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে খুলনা ও সিরাজগঞ্জে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে দুটি পাটকল ইজারা পেয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। অন্যটি পেয়েছে হ্যামকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ইজারা পাওয়া দুুটি পাটকল হলো- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার চন্দনীমহলে অবস্থিত স্টার জুট মিলস লিমিটেড ও সিরাজগঞ্জের রায়পুরে অবস্থিত জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড। ৩০ বছরের জন্য ইজারা পাওয়া এ দুটি পাটকলে ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল। যেখানে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে। দুই কারখানা থেকে বছরে ১১০০ কোটি টাকার টার্নওভার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ইজারার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তিতে বিজেএমসির পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কবির উদ্দিন সিকদার সই করেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পক্ষে কোম্পানি সচিব আমিনুর রহমান ও হ্যামকো গ্রুপের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম মোস্তফা চুক্তিতে সই করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী এবং বিজেএমসি ও লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পকারখানার ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন দুটি বন্ধ পাটকল ইজারা পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। যার মধ্যে রয়েছে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার চন্দনীমহলে অবস্থিত স্টার জুট মিলস লিমিটেড ও সিরাজগঞ্জের রায়পুরে অবস্থিত জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড। অন্যদিকে, একই মেয়াদে (৩০ বছর) খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ইজারা পেয়েছে হ্যামকো গ্রুপ।
চুক্তি অনুযায়ী, ইজারার আওতায় খুলনার স্টার জুট মিলসের ৪৫ দশমিক ৯৯ একর এবং সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসের ৩৭ দশমিক ৯৭ একর জমি রয়েছে।
বিজেএমসির আওতায় মোট ২৫টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ইজারার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪টি পাটকল বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি চালু হয়েছে এবং বাকি ৭টি চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এবার নতুন করে আরও তিনটি পাটকল ইজারা দিলো সরকার।
সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস, ডেনিম পণ্য, জ্যাকেট, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, হস্তশিল্প, ব্যাগ, ফুটওয়্যার ও খেলনা উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক কাঁচামাল, প্যাকেজিং এবং পণ্য সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এ প্রকল্পে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। ফলে ৬ হাজার ৫০০ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কারখানাটি থেকে বছরে ৬০০ কোটি টাকার টার্নওভার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, খুলনার স্টার জুট মিলস লিমিটেডে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। সেখানে ভ্যালু অ্যাডেড পাটজাত পণ্য, ফার্নিচার, মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার (এমডিএফ) বোর্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটিতে আধুনিক কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও ফিনিশড গুড সংরক্ষণ সুবিধাও থাকবে। এর মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ কারখানা থেকে বছরে ৫০০ কোটি টাকার টার্নওভার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, দুটি জুট মিলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মোট বিনিয়োগ হবে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। দুই কারখানায় প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ মানুষের। দুটি কারখানা থেকে বছরে মোট টার্নওভারের লক্ষ্য এক হাজার ১০০ কোটি টাকার।
এর আগে ইজারা নেওয়া রাজশাহী জুট মিলসেও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেড উৎপাদন শুরু করেছে। সেখানে বর্তমানে এক হাজার ৩০০ জন কাজ করছেন। দৈনিক প্রায় পাঁচ হাজার জোড়া জুতা, এক হাজার ৩০০ পিস ছাতা এবং প্রায় ৪০০ পিস তাঁবু উৎপাদন হচ্ছে।
বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মামনুর রশিদের ভাষ্য, ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম ৩০ মাস মেশিনারি স্থাপন, কারখানা আধুনিকায়নসহ অন্যান্য কার্যক্রম গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেয়েছে। এর মধ্যে যেসব মিল চালু হয়েছে, সেগুলো শুরু থেকেই ভালো করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হয়েছে এবং রপ্তানিতেও বড় অবদান রাখছে তারা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের উদ্দেশ্য হচ্ছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই দুটি পাটকলকে আধুনিক উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এর মাধ্যমে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন গন্তব্য খুঁজছেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বাইরেও জুতা, ব্যাগ, তাঁবু, ছাতা, খেলনা, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল ও গৃহস্থালি পণ্যের চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
শিল্পগোষ্ঠীটির লক্ষ্য, তৈরি কারখানাগুলো কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা হবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও জোরদার হবে।
এ বিনিয়োগের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দক্ষ জনশক্তি ও শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।









































