Home আলোচিত সংবাদ খোলসের নিচে হিংস্রতা: মিলনের কান্না আর আমাদের ঘুমন্ত বিবেক

খোলসের নিচে হিংস্রতা: মিলনের কান্না আর আমাদের ঘুমন্ত বিবেক

31


আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কঠিন শপথ নিয়ে যারা বুক ফুলিয়ে হাঁটেন, সমাজের অন্যায় দূর করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই মানুষগুলোর ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা এতটা কুৎসিত হতে পারে-তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।


খুলনার সোনাডাঙ্গায় ক্ষমতার দাপট আর খোলসের নিচে লুকিয়ে থাকা যে চরম অমানবিকতার চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল একজন অবলা কিশোরী গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন নয়, বরং আমাদের গোটা সভ্যতার মুখে এক বড় চপোঘাত। কিশোরী মিলনের অপরাধ ছিল সামান্য-তরকারি পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি হিসেবে তার ওপর যে মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালানো হলো, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। নিজের মায়ের কোল ছেড়ে, একটু ভালো থাকার আশায়, দুমুঠো ভাতের জন্য যে মেয়েটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ঘর আগলে রাখল, তাকেই কি না সইতে হলো গরম কড়াইয়ের নিষ্ঠুর ছ্যাঁকা!


যে হাত সমাজকে পাহারা দেওয়ার কথা, সেই হাত দিয়ে নিজেরই ঘরের এক অসহায় শিশুকে মারধর আর পুড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করার পর কি ওই এএসআই দম্পতির এতটুকুও বুক কাঁপেনি? পাশের ভবন থেকে এক সাংবাদিকের ক্যামেরায় যখন সেই নির্যাতনের দৃশ্য বন্দী হচ্ছিল, তখন হয়তো চার দেয়ালের ভেতরে মিলনের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, যা পৌঁছায়নি ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হওয়া গৃহকর্তা-কর্ত্রীর কানে।


অথচ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর যখন দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠল, তখনো নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার শেষ চেষ্টাটুকু করেছেন তারা। আইনের মানুষ হয়েও আইন ও মানবতার সাথে এমন তামাশা আর কী হতে পারে! খবর পেয়ে দূর নরসিংদী থেকে যখন মিলনের মা মিনতি রানী বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে খুলনায় ছুটে এলেন, তখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তার কলিজার টুকরো।


যে মা ভেবেছিলেন তার সন্তান পুলিশের ঘরে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, সেই মায়ের আজ অনুশোচনার শেষ নেই; অশ্রুভেজা চোখে মিনতি রানীর একটাই আকুতি, আমি আর কিছু চাই না, আমার মেয়েকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন। একজন মায়ের এই অসহায় দীর্ঘশ্বাস আমাদের সমাজব্যবস্থার ভেতরের কঙ্কালটাকে স্পষ্ট করে দেয়। মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, পুলিশ প্রশাসন বিভাগীয় ব্যবস্থার কথা বলছে, আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠিয়েছে-আইনি প্রক্রিয়া হয়তো তার নিজের গতিতে চলবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আমাদের সামাজিক বিবেকের কাছে; আমরা আর কতদিন এই অবলা, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ওপর চলা ঘরের ভেতরের অন্ধকার রাজত্বকে মুখ বুজে সহ্য করব?


আজ মিলনদের এই রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে, ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা এমন হিংস্র মানসিকতার মানুষদের মুখোশ উন্মোচিত না হলে-আমরা কোনোদিনও একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব না। খুলনা মেডিকেল কলেজের ওসিসি-র বিছানায় শুয়ে থাকা মিলন কেবল একটি নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়ে নয়, সে আজ আমাদের ঘুমন্ত বিবেকের দিকে চেয়ে থাকা এক জীবন্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন!

  • -মিজানুর রহমান মিলটন, তারেরপুকুর, খুলনা।