মিলি রহমান।।
রাতে কি আপনার বিছানার সঙ্গী বা পার্টনার প্রায়ই অভিযোগ করেন যে আপনি অতিরিক্ত জোরে নাক ডাকছেন? কিংবা ঘুমের ঘোরে হঠাৎ দম আটকে আসার মতো হাঁসফাঁস করছেন? যদি এমনটা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি মোটেও হেলাফেলার নয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, এটি হতে পারে ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (ওএসএ)—যার কারণে ঘুমের মধ্যে সাময়িকভাবে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই নীরব ঘাতক ব্যাধিটি সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও সতর্কতা শেয়ার করেছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) মানুষ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত। তবে আশঙ্কার কথা হলো, এর মধ্যে মাত্র ৬০ লাখ মানুষের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তারা এই সমস্যায় ভুগছেন।
চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে, সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্মৃতিভ্রম এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রোগটি যেভাবে বাসা বাঁধে
মায়ামির স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. আলেহান্দ্রো ডি. চেডিয়াক জানান, স্লিপ অ্যাপনিয়া হুট করে হয় না, এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। সাধারণত ঘুমের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় শ্বাস বন্ধ হওয়ার সূচককে বলা হয় ‘অ্যাপনিয়া-হাইপোপনিয়া ইনডেক্স’। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই সূচক ৫ বা তার কম থাকে।
তিনি বলেন, ‘ওজন একটু বেড়ে গেলে প্রথমে হয়তো প্রতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ বার এমন হতে পারে, যা শুরুতে তেমন গায়ে লাগে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং ওজন আরও বৃদ্ধি পেলে এই সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে।’ অনেকেই দিনের বেলার ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাবকে বয়স বা লাইফস্টাইলের পরিবর্তন মনে করে এড়িয়ে যান, যা পরে মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
শ্বাসনালীতে প্রতিবন্ধকতা ও লক্ষণ
শিকাগোর পালমোনোলজিস্ট ড. জেমস হার্ডেজেন জানান, স্লিপ অ্যাপনিয়া মূলত শ্বাসনালীর একটি যান্ত্রিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। নাক ও গলার ভেতরের টিস্যু বা টনসিলের গঠনগত সমস্যা, বংশগত কারণ, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শোয়ার ধরনের কারণে এটি হতে পারে। ঘুমের ওষুধ ও স্লিপ স্পেশালিস্ট ড. ইলেন রোজেন স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং হাইপোপনিয়ার পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, ‘যখন ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় সেটা হলো অ্যাপনিয়া। আর যখন শ্বাসনালী পুরোপুরি বন্ধ না হলেও মারাত্মকভাবে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয় সেটাকে বলে হাইপোপনিয়া। উভয় ক্ষেত্রেই অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে মস্তিষ্ক শরীরকে জাগিয়ে তোলে, ফলে ঘুম ভেঙে যায়।
নারী বনাম পুরুষ এবং স্থূলতার সম্পর্ক
চিকিৎসকদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ সমান থাকলেও, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পুরুষরা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হন। তবে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর নারীদের আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তারা পুরুষদের সমপর্যায়ে চলে আসেন।
এছাড়া স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ওজন বাড়লে শ্বাসনালী সংকুচিত হয়, ঘুম নষ্ট হয় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়—যা রোগীকে আরও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে প্ররোচিত করে ওজন আরও বাড়িয়ে দেয়।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
স্লিপ অ্যাপনিয়া নির্ণয়ের জন্য এখন ঘরে বসেই ‘হোম স্লিপ টেস্ট’ করা সম্ভব। তবে চিকিৎসকরা নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের জন্য ল্যাব টেস্টকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করেন। রোগ শনাক্ত হলে নিচের চিকিৎসাগুলো দেওয়া হয়:
১. প্যাপ থেরাপি: এটি সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। একটি মেশিনের সাহায্যে মৃদু বাতাসের চাপ দিয়ে শ্বাসনালীকে সারারাত উন্মুক্ত রাখা হয়।
২. ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স: মৃদু থেকে মাঝারি আক্রান্তদের জন্য দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে মুখের বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, যা চোয়ালকে সামনের দিকে টেনে রাখে।
৩. ওজন কমানোর ওষুধ: সম্প্রতি এফডিএ অনুমোদিত ইনজেকশন ‘টির্জেপ্যাটাইড’ ওজন কমানোর মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগী সম্পূর্ণ নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছে।
৪. ইমপ্লান্টযোগ্য ডিভাইস: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জিবকে শ্বাসনালীর পথ থেকে দূরে রাখতে উদ্দীপক ডিভাইস বসানো হয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
যদি আপনি ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও সকালে ক্লান্ত বোধ করেন, তবে বুঝতে হবে আপনার ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটছে। চিকিৎসকদের শেষ কথা—নাক ডাকা মানেই স্লিপ অ্যাপনিয়া নয়, আবার নাক না ডাকলেও এই রোগ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।











































