বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ভেতরে যে অসন্তোষ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠছে, তা শুধু তাৎক্ষণিক নয়—বরং দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্য একটি বড় সংকেত হিসেবেই দেখা উচিত।
দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন। নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া, দলীয় কমিটিতে স্থান না পাওয়া কিংবা নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া—এসব কারণে তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা অনেকেই এখন নিজেদের প্রান্তিক মনে করছেন, যা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই সুসংবাদ নয়।
বিশেষ করে অভিযোগ উঠেছে যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, ফোনে যোগাযোগ না পাওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় পাশে না থাকার মতো বিষয়গুলো নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। অথচ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের মূল ভিত্তি হচ্ছে এই তৃণমূলই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
দলের সিনিয়র নেতা রুহুল কবির রিজভী নিজেও এই বাস্তবতা তুলে ধরে বলেছেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নেই অনেক নেতার। বরং সেখানে ভিড় বাড়ছে তদবিরবাজদের। এই মন্তব্য দলীয় কাঠামোর ভেতরে একটি অস্বাস্থ্যকর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রকৃত কর্মীদের চেয়ে সুযোগসন্ধানীদের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো—এই হতাশা এখন ব্যক্তিগত ক্ষোভের সীমা ছাড়িয়ে সাংগঠনিক ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। কেউ কেউ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন, কেউ অন্য দলে যোগদানের কথাও ভাবছেন। ইতোমধ্যে ইসহাক সরকার-এর মতো নেতার দলত্যাগ সেই প্রবণতার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। এটি যদি বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে তা দলের জন্য বড় ধরনের সাংগঠনিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
রাজনীতিতে মনোনয়ন বা পদ-পদবি না পাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না কিংবা যোগাযোগের অভাব দেখা দেয়। একজন কর্মীর কাছে সম্মান ও স্বীকৃতি অনেক সময় পদ-পদবির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাটিতেই বর্তমানে ঘাটতি স্পষ্ট হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দলের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আস্থা পুনর্গঠন। তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, দলীয় কার্যালয়ে সক্রিয় উপস্থিতি, অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া—এসব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি তদবির ও প্রভাবের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্যতা ও ত্যাগকে প্রাধান্য দিতে হবে।
একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি কেবল তার শীর্ষ নেতৃত্বে নয়, বরং তার নিবেদিত কর্মীদের মধ্যেই নিহিত থাকে। সেই কর্মীরাই যদি হতাশ হয়ে পড়েন, তাহলে সংগঠনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এখনই প্রয়োজন বাস্তবতা অনুধাবন করে সংশোধনের পথে হাঁটা।
অন্যথায়, এই নীরব অসন্তোষই একসময় বড় সংকটে রূপ নিতে পারে—যার দায় এড়ানো তখন আর সম্ভব হবে না।










































