আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা এক যুগের বেশি সময় শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ১৮৪টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। অন্যদিকে, মাত্র ৬৪টি আসনে জয় পেয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস।
এদিন ভোটের ফলাফল সামনে আসতেই কলকাতা থেকে জেলা সর্বত্র বিজেপি কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়োল্লাসে মেতে ওঠে গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। পাশাপাশি সিঙ্গুরে ঝাল-মুড়ি বানিয়ে, ভাগ করে খান বিজেপি কর্মীরা। দেড় দশক আগে হুগলির সিঙ্গুর থেকে উত্থান হয়েছিল তৃণমূলের। সেই সিঙ্গুরেই তৃণমূল দুর্গের পতন ঘটিয়ে উত্থান হলো বিজেপির।
রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্নাকে পিছনে ফেলে বিজেপির প্রার্থী অরূপ কুমার দাস এগোতেই আনন্দে ঝালমুড়ি বানিয়ে খান বিজেপি কর্মীরা। আবার বুলডোজার নিয়ে অভিনবভাবে জয়ের আনন্দে মাতেন মালদহের বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। সেই সঙ্গে একাধিক ডিজে বাজনা ও চলছে আবির খেলা। এমনকি, দলটির রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেও উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে দেখা যায়। দলের কর্মী-সমর্থকরা তাকে মিষ্টিমুখ করান। এরপর বাজনার তালে তালে নৃত্য করতে দেখা যায় সাবেক এই কূটনীতিকে।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসনে। বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। নন্দীগ্রামের পর এবার ঘরের মাঠেও পরাজয় বরণ করতে হলো তাকে।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপি এককভাবে ১৮৪টি আসন জিতে সরকার গঠনের পথ পরিষ্কার করেছে। বিপরীতে তৃণমূলের আসন সংখ্যা গতবারের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৪-তে।
মমতা সরকারের এই বিশাল পতনের পর রাজ্য সচিবালয় নবান্নে এখন পালাবদলের আবহ। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপির পক্ষ থেকে কার নাম ঘোষণা করা হবে, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সকাল থেকেই নবান্নের প্রতিটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সরকারের মুখ্যসচিবের বিশেষ নির্দেশনার পর এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মুখ্যসচিবের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সচিবালয় বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দপ্তর থেকে কোনো নথি সরানো, নষ্ট করা বা ফটোকপি করা যাবে না। এমনকি কোনো নথির স্ক্যান কপিও করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো বিভাগে নথিপত্র নিয়ে এদিক-সেদিক হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নবান্নে কর্মরত প্রতিটি কর্মীকে আজ ব্যাপক তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রবেশের সময় পরিচয়পত্র যাচাই করার পাশাপাশি বের হওয়ার সময় কর্মীদের ব্যক্তিগত ব্যাগ এবং শরীর তল্লাশি করা হচ্ছে। এক সরকারি কর্মী গণমাধ্যমকে জানান, আগে কখনো নবান্নের ভেতরে কেন্দ্রীয় জওয়ানদের এভাবে ব্যাগ বা ফাইলপত্র চেক করতে দেখিনি। আজ বডি সার্চও করা হচ্ছে।
এপিবি আনন্দের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি বা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ফাইল যাতে সরিয়ে ফেলা না যায়, তার জন্যই এই বিশেষ সতর্কতা। সরকার বদলের সন্ধিক্ষণে কোনো অসাধু চক্র যাতে প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে সেই নজরদারি চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটদানের হারের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নবান্নের এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নথিপত্র রক্ষায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এবারে দুদফায় বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। প্রথম দফায় গত ২৩ এপ্রিল ভোটগ্রহণ হয় দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুরে।
দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয় গত ২৯ এপ্রিল। ভোটগ্রহণ হয় নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানে। দুই দফাতেই এবার রেকর্ড হারে ভোটদান হয়। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের তুলনায় ২০২৬-এ ভোটার সংখ্যা ৫১ লাখ কমলেও, গতবারের তুলনায় এবার প্রায় ৩১ লাখ ভোট বেশি পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৮২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আর এবার ২০২৬-এ গড়ে ভোট পড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ, গতবারের তুলনায় এবারের নির্বাচনে প্রায় ১১ শতাংশ ভোট বেশি পড়েছে। এই বিপুল ভোটদান নজিরবিহীন এবং সর্বকালীন রেকর্ড। শতাংশের পাশাপাশি রেকর্ড তৈরি হয়েছে সংখ্যার হিসাবেও। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে এবারের মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৩৪ লাখ। এসআইআর-এর জেরে এবার ভোটার সংখ্যা কমে হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ। অর্থাৎ, ২০২১-এর তুলনায় এবার ৫১ লাখ ভোটার কমেছে।
তবে মোট ভোটার কমলেও প্রদত্ত ভোট চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ২০২১-এ ভোট দিয়েছিলেন ৬ কোটি ৩ লাখ ভোটার। আর, এবার মোট ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৩৪ লাখ ভোটার। ২ দফা মিলিয়ে ২০২১-এর তুলনায় ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩১ লাখ। প্রথম দফায় যে ১৬টি জেলায় ভোট হয়েছে, ২০২১-এর তুলনায় সেই জেলাগুলিতে, প্রায় সাড়ে ২১ লাখ বেশি ভোট পড়েছে। আর, দ্বিতীয় দফার ৭ জেলায় বেশি ভোট পড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ।










































