আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের আশঙ্কায় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রায় ২৩ হাজার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি একাধিক ট্রেন বাতিল এবং ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককোরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)। এই কর্মসূচিকে ঘিরেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনে শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নির্ধারিত মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি)। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ বহাল থাকতে পারে।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যানজট ও জননিরাপত্তার আশঙ্কায় বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। তবে আয়োজকেরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে শনিবার রাজধানীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকে নজর রয়েছে সবার।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিক্ষোভ
এই বিক্ষোভের মূল কারণ ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম। দেশজুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, যাচাই কার্যক্রমে প্রায় ১৩ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সংখ্যা নির্বাচন কমিশনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত; বাদ পড়া সব নাম যে ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের সমর্থক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এতে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলও প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে বলে দাবি তাদের।
তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, দ্বৈত ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
এই বিতর্কের মধ্যেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিজেপি। সংগঠনটি শুরুতে অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। চলতি বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তাদের আন্দোলনের পর ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও সংগঠনটির জনপ্রিয়তা বাড়ায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
৫৭টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ
শনিবারের বিক্ষোভ কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএমআরসি। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিধিনিষেধ কার্যকর থাকতে পারে। এর ফলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রগুলোতে যাত্রীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রভাবিত স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, নয়াদিল্লি, প্যাটেল চক, জনপথ, মান্ডি হাউস, বারাখাম্বা রোড, আইটিও, দিল্লি গেট, খান মার্কেট ও কাশ্মীরি গেট। এসব স্টেশনের অনেকগুলোই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা, সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন মেট্রোরুটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
তবে সব স্টেশনে মেট্রো চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকবে- বিষয়টি এমন নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকলেও নয়াদিল্লি স্টেশন ছাড়া অন্য প্রভাবিত স্টেশনগুলোতে মেট্রোর লাইন পরিবর্তন বা ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা চালু রাখার কথা জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রেনের চলাচলের ব্যবধানও পরিবর্তন করা হতে পারে।
২৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী, আটক আন্দোলনকারীরা
দিল্লিতে নিরাপত্তার জন্য ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ২২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কোম্পানিতে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ), সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন আধাসামরিক ইউনিটের সদস্য রয়েছেন। নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত পাঁচটি আধাসামরিক কোম্পানিকেও দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিক্ষোভস্থল ও প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড, সিসিটিভি এবং অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এদিকে, বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লির পথে থাকা কয়েকজন কর্মী ও শিক্ষার্থীকে আটক করার অভিযোগ তুলেছে আন্দোলনকারীরা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজেপির দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজ্যে তাদের সমর্থকদের আটক করা হচ্ছে। তবে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
গণপরিবহনে বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের
বিক্ষোভ ঠেকাতে গণপরিবহনে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্টেরও নজরে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত কর্তৃপক্ষকে বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করতে ও গণপরিবহনব্যবস্থা যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছে।
গণপরিবহনে বিধিনিষেধের ফলে শুধু বিক্ষোভকারীরাই নয়, সাধারণ যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ এবং অন্যান্য যাত্রীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।











































