খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
কোটা সংস্কার, সরকার পতনসহ নানা দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামে সরব ছিল পুরো বছর। নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত দেড় হাজার সাধারণ মানুষ। বছর জুড়ে চলা এসব ঘটনার মধ্যে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামই বেওয়ারিশ ৫১৬ লাশ দাফন করেছে। যাদের বেশির ভাগেরই দাফন করা হয়েছে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
রাজধানীর রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে দেখা গেছে, কবরস্থানটির ৪ নম্বর ব্লকে সারিবদ্ধভাবে অজ্ঞাতনামা লাশ দাফন করা হয়েছে। এসব কবরের কোনোটাতেই নেই কোনো নামফলক, চিহ্ন বা সাইনবোর্ড। নতুন কবরগুলো বাদে বেশির ভাগ কবরেরই উঁচু ঢিবি সমান হয়ে গেছে। কোনো কোনো কবরের মাটি সরে ফাঁকা হয়ে গেছে।
গোরস্থানটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাওলানা ফেরদৌস বলেন, বেওয়ারিশ লাশগুলো সাধারণত গোরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকে দাফন করা হয়। অন্যান্য ব্লকের কবরগুলো তাদের স্বজনদের মাধ্যমে দেখাশোনা করা হয়। এতে সেগুলোর পাশে নামফলক থাকে। স্বজনরা কেউ গাছ লাগান, কেউ দামি ঘাস লাগান। তবে বেওয়ারিশ লাশের ক্ষেত্রে সেটি হয় না। এক্ষেত্রে কবরের ওপর থাকে শুধুই মাটি। তাই বেওয়ারিশ লাশের কবর দেখলেই বোঝা যায়। রহম আলী, নজরুল ইসলামসহ কবরস্থানে কাজ করা বেশ কয়েকজন গোরখোদক ৪ নম্বর ব্লকের কবরগুলো দেখিয়ে বলেন, এগুলো সব বেওয়ারিশ লাশ। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম থেকে আমাদের কাছে পাঠায়, আমরা দাফন করি। তারাই গোসল করিয়ে দাফনের কাপড় পরিয়ে আমাদের কাছে আনে। আমরা শুধু দাফন করি। এজন্য কে কীভাবে মারা গেছেন সে সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু বলতে পারি না। তারা বলেন, যদি কারও পরিচয় মেলে তার লাশ উঠিয়ে নেয় না। এখানেই থাকে। কারণ কোনটা কার কবর বলা খুব মুশকিল। তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের দায়িত্বে থাকা গোলাম রব্বানী বলেন, অজ্ঞাতনামাদের লাশ দাফনের ক্ষেত্রে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম শুধু কাফনের কাপড় দেয়। বাঁশ, চাটাইসহ অন্যান্য খরচ কবরস্থানের পক্ষ থেকে বহন করা হয়। মাস শেষে এসবের হিসাব সিটি করপোরেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে বেওয়ারিশ লাশের সিংহভাগই আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে দাফন করা হয়।
আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম সূত্র জানায়, এ বছরের জানুয়ারিতে ৪৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩, মার্চে ৪৯, এপ্রিলে ৩৭, মে’তে ৫৯, জুনে ৪৮, জুলাইতে ৮১, আগস্ট ৩৪, সেপ্টম্বরে ৩৪, অক্টোবরে ৪৪, নভেম্বর ৫৩ জনের লাশ বেওয়ারিশ ভাবে দাফন করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আগে ও পরের সময়ে সবচেয়ে বেশি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সে হিসাবে জুলাই-আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই শুধু বেওয়ারিশভাবে দাফন করা হয়েছে ১৪৯ জনের লাশ। গত জুলাই মাসের এক তারিখ থেকে আগস্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১১৫ জনের লাশ বেওয়ারিশভাবে দাফন করেছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। তাদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। যাকে সেই দেশের অনুরোধে বাংলাদেশে দাফন করে আঞ্জুমান। বাকি ১১৪ জনই জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে নিহত। যাদের শাহবাগ থানার মাধ্যমে আঞ্জুমানে পাঠায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। শেরে বাংলা নগর থানার মাধ্যমে হস্থান্তর করে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এছাড়াও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপতাল, কমলাপুর রেলওয়ে থানাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে লাশগুলো আসে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। যা বেওয়ারিশভাবে উত্তর সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থান মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের পরিচালক মো. শফিউর রহমান বলেন, জুলাই-আগস্টে আমাদের হাসপাতালের মর্গে সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক লাশ এসেছিল। তাদের প্রত্যেকের শরীরেই গুলির চিহ্ন ছিল। সবশেষ আমাদের মর্গে পাঁচটি লাশ ছিল। আমরা তাদের লাশ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলাম। পরে দু’টি দু’টি করে মোট চারজনের লাশ তাদের স্বজনরা নিয়ে গেছেন। আর দীর্ঘদিন মর্গে রাখার পরও যাদের পরিচয় শনাক্ত হয়নি তাদের আঞ্জুমানের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলের মর্গ সহকারী রামু চন্দ্র দাস বলেছেন, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় আমাদের এখানে আসা লাশগুলোর বেশির ভাগই তাদের স্বজনরা শনাক্ত করে নিয়ে গেছেন। আর দীর্ঘদিন মর্গে রাখার পরও যেসব লাশের নাম-ঠিকানা বা পরিচয় পাওয়া যায়নি, তাদের শাহবাগ থানার মাধ্যমে আঞ্জুমানের কাছে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। যে লাশ পাঠানো হয়েছিল তাদের কয়েকজন গুলিবিদ্ধ ছিল, আর কয়েকজনের শরীরে মারাত্মক জখমের আঘাত ছিল।
এসব বিষয়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবাকর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, সাধারণত যদি কখনো কোথাও বেওয়ারিশ লাশ থাকে দীর্ঘদিন ধরে কেউ লাশের খোঁজ নিচ্ছে না বা স্বজনদের কোনো খোঁজ নেই তখন সেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের খবর দেয়া হয়। আমরা তখন এসব লাশ আমাদের নির্ধারিত কবরস্থানে নিয়ে রীতিনীতি অনুযায়ী দাফন করে থাকি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এই কাজগুলো করে আসছি। তিনি বলেন, অনান্য বছরে আমাদের দাফন করা লাশের সংখ্যা তিন থেকে চারশ’র ঘরে থাকে। ২০২১ সালে সারা বছরে ৪৬৫ জন, ২০২২ সালে ৪৪৩ জন, ২০২৩ সালে ৪৯০ জনের বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছিলাম। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাত্র ১১ মাসেই অন্তত ৫১৬ জনের লাশ বেওয়ারিশ ভাবে দাফন করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লাশ এ বছর দাফন করা হয়েছে জুলাই মাসে। আন্দোলনের দুই মাসে মোট ১১৫ জনের লাশ বেওয়ারিশভাবে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বেওয়ারিশভাবে দাফন করা লাশগুলোর ছবি, ডিএনএ প্রোফাইল আমাদের ও সংশ্লিষ্ট থানার কাছে রাখা থাকে। অনেকেই অনেক সময় আমাদের কাছে খোঁজ নিতে আসে। তখন নিহতদের ছবির সঙ্গে স্বজনদের কাছে থাকা ছবি ও ডিএনএ মেলানো হয়। যদি কারোর সঙ্গে স্যাম্পল মিলে যায় তখন তাদেরকে কবরস্থানে পাঠানো হয়। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।-মানবজমিন











































