স্টাফ রিপোর্টার
সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলার পশুর নদীর তীরে জেগে ওঠা চরের নাম কৈ-গরদাশকাঠি চর। অর্ধশত বছর আগে থেকেই এই চরে বসবাস করা শুরু করে অনেক হতদরিদ্র পরিবার। পশুর নদী থেকে বিভিন্ন মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে বছরের পর বছর ধরে তাদের জীবন-জীবিকা চলে আসছিল।
এ চরের দক্ষিণ পাশে ছিল সাপমারি বিল। যা এখন রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নামেই পরিচিত।এক সময় বাগেরহাটের সবচেয়ে বেশি চিংড়ি উৎপাদন হতো এখান থেকে। এ বিলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির সঙ্গে পশুর নদীর সরকারি খাস জমিও ছিল এখানে। ২০১০ সালের পরে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এই এলাকায় জমি অধিকগ্রহণ করে সরকার।
এরপরে অনেক পরিবার কৈ-গরদাসকাঠি চরে এসে আশ্রয় নেয়। কেউ ভূমিহীন হিসাবে আবার কেউ পশুর নদীতে মাছ ধরে জীবন চালানোর আশায় বসবাস শুরু করে এখানে। হত-দরিদ্র এসব জেলে পরিবারের সুন্দর জীবন যাপনের কথা চিন্তা করে ২ বছর আগে ধাপে ধাপে এসব পরিবারকে ২ শতক জমিতে ১৪০টি ঘর প্রদান করে সরকার। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তাদের ছোট্ট একটি টিনশেড ঘর দিলেও জীবিকার কোন পথ পাচ্ছে না এখানকার ৬ শতাধিক পরিবার। খাস জমিতে সরকারি ঘর পাওয়া ইসরাত আলী গাজী জানান, প্রথমে সাপমারি বিলের খাস জমিতে বসবাস করতাম। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হবে তাই চলে সেখান থেকে চলে এসে কৈ-গরদাশকাঠি চরে বসতি স্থাপন করি। এক ছেলে আর এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে এই ঘরেই বসবাস করেন তিনি। যদিও কিছুদিন আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে বেশি লেখাপড়া না করলেও দিনমজুরের কাজ করে চলে তাদের। আগে পশুর নদীতে পোনা মাছ ও বিভিন্ন মাছ এবং কাকড়া ধরে জীবন চলতো। কিন্তু এখন তা আর হয় না। এ নদীতে তেমন কোন মাছ নাই। এ বছর কোন ইলিশ মাছ পাননি এই পশুর নদী থেকে। প্রতিবছর ইলিশের মৌসুমে হাজার হাজার টাকা আয় করে আমাদের পরিবার চলত। কিন্তু এখন তা আর হয় না। অনেক কষ্টে পরিবার চালান বলে জানান তিনি।
এই চরে বসবাসকারি অধিকাংশই জেলে পরিবার। সরকারি ঘর পাওয়া এখানে বসবাসকারী প্রায় ৮০ বছরের জেলে আরব আলী গাজী। তিনি জানান, জেলে কার্ড থাকলেও কোন সুযোগ-সুবিধা পান না তিনি। বয়সের ভারে এখন তেমন কোন কাজও করতে পারেন না। এই চরে এক সময়ে ধান এবং মাছ উৎপাদন হতো যা দিয়ে তাদের জীবন চলতো। এখন এখানে বালু ভরাট করে গুচ্ছগ্রাম করে দেয়া হয়েছে। পাশে পশুর নদী থাকলেও আগের মত কিছুই পাওয়া যায় না। আয় রোজগারের অভাবে অনেকে এখান থেকে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। সেখানেই কোন রকমে আয় রোজগার করে দিন কাটায়।
৬০ ঊর্ধ্ব বয়সের ফজিলা খাতুন নামে এক নারী জানান, ঘর পাইছি ঠিকই কিন্তু বসবাসের জন্য তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা নেই আমাদের। সুন্দরবনের পাশে পশুর নদীর তীরে এই চরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবসময় লেগেই থাকে। বলা যায় প্রতিনিয়ত হুমকির মধ্যেই দিন কাটাই। বৃষ্টি হলে এখানে হাঁটু পানি জমে থাকে। পানি বের হওয়ার কোন জায়গা নেই। দুই শতক জমিতে ঘরই ঠিক মত হয় না। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল এখানে লালন-পালন করা যায় না।
রাফিজা নামের ৩০ বছরের আরও এক নারী জানান, এখানে তো হাসপাতাল নেই। রামপাল উপজেলা সদর এখান থেকে ১২-১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে। অসুস্থ রোগী নেয়ার সময় অবস্থা আরও করুণ দশা হয়ে যায় তাদের। রাস্তাঘাটের অবস্থা আরও বেহাল দশা। এই উপজেলায় বাস করে স্বাস্থ্য সেবা নিতে যেতে হয় আরেক উপজেলায়। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার কথাই বলছিলেন তিনি। পরিবার পরিকল্পনার লোকতো ৩-৪ বছর ধরে এখানে আসেই না। ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল সমস্যা নিয়ে দিন কাটাতে হয় নারী-পুরুষ সকলের। তাদের দেখাশোনার জন্য কোন সরকার আছে বলে মনে হয় না। শুধুই এসব নারীই নয়। রোকেয়া বেগম, মনিরা বেগমসহ অনেকেই জানান। ১০ বছর আগে যেভাবে খেয়ে পরে দিন কাটাতাম এখন কিন্তু সেটা আর পারি না। তিন বেলা পেট পুরে অনেকেই খেতে পারি না।
তানিয়া বেগম নামের আরও এক নারী জানান, এর আগে একটি এনজিও থেকে কয়েকটি ভেড়া দিলেও সেগুলো মারা গেছে। তারা বলছে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যই আজকে জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু এগুলো দেখার যেন কেউ নাই। সরকার ঘর দিয়ে পাশে দাঁড়ালেও সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই চরের হতদরিদ্র শত শত পরিবার।
বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ইউনিয়নের নাম গৌরম্ভা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নটি মোংলার পশুর নদীর চরে অবস্থিত কাপাসডাঙ্গা গ্রামে গড়ে উঠা অবহেলিত জনপদ কৈগরদাশকাঠি চর। শুধু তাই নয়, এই চরটি একদিকে বাগেরহাটের রামপাল ও খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত। অন্যদিকে রামপাল উপজেলা সদর থেকে ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও এই চরের পশ্চিমে পশুর নদী ও খুলনার দাকোপ উপজেলা। আর পূর্বে রয়েছে কাপাসডাঙ্গা গ্রাম এবং দক্ষিণে বহুল আলোচিত-সমালোচিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ উত্তরে রয়েছে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা।
সরকারী খাস জমি হওয়ায় এই চরের বাসিন্দাদের প্রশাসনের যখন তখন বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ স্থান হারানোর শঙ্কাও রয়েছে এসব বাসিন্দাদের। দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এই জনবসতিদের জন্য সরকারি সুযোগ সুবিধা একদম নেই বললেই চলে। বর্তমানে এ চরে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষই রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ করার পর এ চরে এসে বসবাস করছেন।
জানা যায়, ২০১০ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় এই প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর কৃষি, মৎস্য ও আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যার ৯৫ শতাংশই তিন ফসলি কৃষি জমি, যেখানে বছরে ১২৮৫ টন ধান ও ৫৬৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই ধান-মাছ উৎপাদন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রায় ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হয় এই জমি অধিগ্রহণ থেকে।
বর্তমানে এটি আর চর নেই। পুরো এলাকায় ঘনবসতিতে রূপ নিয়েছে। জনবসতি বাড়লেও সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। হাঁটি-হাঁটি করে সময় গড়ালেও এখানে বসবাসরত বেশিরভাগ মানুষ ভূমিহীনই রয়ে গেছে। শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, মাথাপিছু আয়, চিকিৎসা সেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জীবন যাত্রার মানসহ সব দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন তারা। এর সঙ্গে সুপেয় পানির তীব্র সংকট, জলাবদ্ধতা, শিশুশ্রম, বেকারত্ব, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারী নির্যাতননের মত সামাজিক ব্যাধিতো রয়েছেই।
এছাড়া কাজের জন্য বাড়ির পুরুষরা এলাকার বাইরে গেলে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় নারী ও কিশোরী মেয়েদের। প্রতিকার না থাকা এবং প্রায়শই এমন ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তহীনতায় থাকেন নারীরা। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদসহ অন্যান্য সেবা পেতে বিলম্বের শিকারা সাধারণ ঘটনা। নিজ এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের খবরে আশায় বুক বেঁধেছিল রামপাল এলাকার কৈ-গরদাশকাঠিবাসী। কিন্তু এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের কোন উপকারে আসেনি। এই এলাকার তেমন কেউ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করতে পারে না। সবাইকে বাইরে থেকে নিয়ে এসে কাজ করে এই বিদ্যুত কেন্দ্রে। এই চরের যে পরিবেশ তাতে বড়-ছোট সকলেরই ডায়রিয়া, এলার্জি, চুলকানি, ঘা, পাচড়া প্রায়ই লেগে থাকে। প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন হলেও তা তারা পায় না বরং আতঙ্কের মাঝে দিন কাটায়। ভুক্ত ভোগীদের প্রশ্ন নতুন বাংলাদেশের অন্তর্র্বতী সরকার কি তাদের নূন্যতম নাগরিক সম্মান ফিরিয়ে দিবে?











































