Home Uncategorized পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি: দেশবাসীর দৃষ্টি এখন ২৮ অক্টোবরে

পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি: দেশবাসীর দৃষ্টি এখন ২৮ অক্টোবরে

59

ঢাকা অফিস।।

আগামী ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ওই দিন রাজধানীর নয়াপল্টন ও বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে দুই দলের ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে জনমনে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। ঢাকায় সমাবেশ হলেও দেশবাসীর নজর ২৮ অক্টোবর ঘিরে। সংঘাতের আশঙ্কা জনমনে থাকলেও বিশ্লেষকরা বড় ধরনের কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন। তবে তারা ছোটখাটো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

তারা মনে করছেন, যেহেতু ঢাকার বাইরে থেকে বহুসংখ্যক নেতা-কর্মী আসার সম্ভাবনা রয়েছে- তাই নাটকীয়ভাবে কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে। তা ছাড়া তৃণমূলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজপথের বিরোধী দল তাদের দাবির পক্ষে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। সেই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায় হবে কি না তা নির্ভর করবে আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা কতটুকু তার ওপর। অন্যদিকে, বড় ধরনের সংঘাত ও সহিংসতা এড়াতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আগামী ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে বিএনপি। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশের অনুমতি চেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) চিঠি দিয়েছে দলটি। একই দিনে ঢাকায় পৃথক পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীরাও। যদিও ওই দিনের মহাসমাবেশ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হবে বলে দাবি করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আমরা কোনো নেতা-কর্মীকে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিইনি। তিনি তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা না দিতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে বিএনপি ও তার আন্দোলন-সঙ্গীদের কর্মসূচির দিনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারাও রাজপথে তাদের শক্তির মহড়া দিয়ে নিজেদের শক্তি ও জনপ্রিয়তা প্রদর্শন করতে চায়। সমাবেশের অনুমতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বরাবর চিঠি দিয়েছে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এর ফলে নিকট-দূরত্বে প্রধান দুই দলের সমাবেশ ঘিরে সহিংসতা ও নাশকতার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে জনমনে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়, সরকারের পতন চায়। তারা এ দাবির পক্ষে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে সে দাবি আদায় হবে কি না তা নির্ভর করবে আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা কতটা পেল। একই দিনে ক্ষমতাসীনদের কর্মসূচি ডাকার সমালোচনা করেন তিনি।

২৮ অক্টোবর সমাবেশ ঘিরে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধীদের উচিত ইশতেহার নিয়ে হাজির হওয়া, আলাপ-আলোচনা করা। ক্ষমতাসীন দলের এ ধরনের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ এড়িয়ে চলা দরকার। কারণ বিরোধীরা তার দাবির পক্ষে যত কর্মসূচি ডাকবে, সব কর্মসূচিতেই যদি ক্ষমতাসীনরা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ডাকে, তা হলে তার শক্তি ক্ষয় হবে, সে দুর্বল হয়ে পড়বে। তা হলে নির্বাচন কীভাবে করবে? বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছি না। যদি হয়ও, সেটা হবে বিচ্ছিন্ন অথবা নাটকীয় কিছু।

এদিকে ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে দুই দলের সমাবেশ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। কী হচ্ছে, কী হবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে, এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করছেন, ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ ঘিরে তেমন কিছুই হবে না। কারণ ওই দিন রাজপথ দখলে রাখবে আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবেন তারা।

মহাসমাবেশের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল রোববার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভা করে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এ সভায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব, সকল বিভাগের সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা বিভাগের সকল মহানগর ও জেলাগুলোর সভাপতি/আহবায়ক/সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি/আহ্বায়ক/সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রতিটি কর্মসূচি আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে করে আসছি। ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশও অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হবে। সিকিউরিটি জন্য আমাদের নিজস্ব যে ব্যবস্থা দরকার, সেটাও নিচ্ছি। কোনো নেতা-কর্মীকে ঢাকায় এসে বসে পড়তে তো বলিনি। বরং বলেছি, ২৮ তারিখের কর্মসূচির পরে যে যার জায়গায় চলে যাবে। পরবর্তী কর্মসূচির জন্য অপেক্ষা করবে। ২৮ অক্টোবর আমরা এমন কোনো কর্মসূচি দেব না যে, তারা (নেতা-কর্মীরা) ঢাকায় বসে থাকবে।

এদিকে ২৮ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে থাকবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর আওয়ামী লীগের যৌথ আয়োজনে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ করবে বলে দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান। এতে বক্তব্য রাখবেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি। সমাবেশ সঞ্চালনা করবেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।

আওয়ামী লীগ শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত করতে চায় বলে দলটির বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য ঢাকা মহানগরের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রতিনিধি সম্মেলন করা হচ্ছে। ওইসব সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকার নেতা-কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ওই দিন সমাবেশের পাশাপাশি সকাল থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সতর্ক অবস্থানে থাকবেন বলেও মহানগর আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা জানান, শুধু ঢাকা মহানগর নয়- রাজধানীর আশপাশের গাজীপুর জেলা, মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের নেতা-কর্মীদেরও ঢাকায় আসার নির্দেশনা দেয়া হবে। একই সঙ্গে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকেও সর্বোচ্চ সংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সংগঠনগুলো এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, গতকাল রোববার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সংবিধান মেনেই নির্বাচন হবে। অবরোধ, দখলের হুমকি দিয়ে তাদের খায়েশ পূর্ণ হবে না। ঢাকা অবরোধ, দখলের নামে আবার অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও–পোড়াওয়ের হুমকি আসছে। যাঁরা মনে মনে স্বপ্ন দেখছেন অবরোধ করে, রাস্তা দখল করে আগের মতো বাস, রেল, মানুষ পুড়িয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে কচুকাটা করবেন, সেটা কোনো দিন হবে না। আমরা হতে দেব না।’

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, আগামী ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ সফল করতে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। বিভিন্ন জেলা থেকে নেতা-কর্মীদের ঢাকায় এনে বড় লোক সমাগম করতে চায় দলটি। তার অংশ হিসেবে জেলায় জেলায় সফর করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।

আগামী ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘বিএনপির মহাসমাবেশ, ছোট সমাবেশ, মাঝারি সমাবেশ এবং তাদের হাঁটা, দৌড় বা বসা কর্মসূচি, ভবিষ্যতে হয়তো হামাগুড়ি দেয়া কর্মসূচি আসবে- এগুলোতে আমরা কখনো চাপ অনুভব করি নাই। আমরা রাজপথের দল, আমরা রাজপথে আছি, রাজপথে থাকব। ২৮ তারিখেও রাজপথ আওয়ামী লীগের দখলে থাকবে।’

তবে জনমনে যত শঙ্কাই থাকুক না কেন, ২৮ অক্টোবর ঢাকায় নাশকতার কোনো আশঙ্কা দেখছে না পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে। আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেব। আগামী ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে আমাদের কাছে নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই।’

তবে বিএনপি শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশের ডাক দিলেও তাদের যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা আছে তারা থাকবেন পুলিশের রেড মার্কিংয়ে। ডিবিপ্রধান জানিয়েছেন, ‘চেকপোস্টে পুলিশের কড়াকড়ি ও তল্লাশি অভিযান থাকবে। আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারেও পুলিশ সক্রিয় থাকবে।’