সয়াবিন তেলের নামে বাজারে পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। গতকালের যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার টন। পাশাপাশি একই সময়ে পাম অয়েল এসেছে ৭ লাখ ৬০ হাজার টন। এর মানে মাত্র ৬ মাসে দেশে সয়াবিনের তুলনায় ২ লাখ টন বেশি পাম অয়েল আমদানি হয়েছে। অথচ বাজারে পাম অয়েল তেমন দেখা যায় না, সিংহভাগই সয়াবিন তেল। বস্তুত অধিকাংশ পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে সয়াবিনের নামে, যা উদ্বেগজনক। জানা গেছে, পাম অয়েল দেশের বেকারি শিল্প, শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট (ডালডা) তৈরিসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যবহার হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়েও খোলা সয়াবিনের নামে তা বিক্রি হচ্ছে; বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সয়াবিনের সঙ্গে পাম অয়েল মিশ্রণ করে সেটি সয়াবিন বলে বিক্রি করছে। এর ফলে হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে দেশের মানুষের, যা রোধ করা জরুরি। আশঙ্কার বিষয় হলো, দেশে ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরি ও বিক্রি কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মুদি দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র অবাধে মানহীন ও ভেজাল পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রচলিত শিশুখাদ্যও আজকাল আর ভেজালমুক্ত নয়। এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধও ভেজালমুক্ত রাখা যাচ্ছে না।
ভেজাল ও মানহীন এসব পণ্য কিনে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন; সেই সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক সরকারি সংস্থা অভিযান চালালেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। এর ফলে ধরা পড়ার পর তাদের অপকর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা পুনরায় একই কর্মে লিপ্ত হচ্ছে। সুস্বাস্থ্যের জন্য চাই স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে অন্তত ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতি বছর দেশে কমপক্ষে ৩ লাখ মানুষ ক্যানসার, ২ লাখ কিডনি রোগ এবং দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও গর্ভবতী নারীরা ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। এছাড়া ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিগত কয়েক বছরে বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অন্তত ৮ হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ভেজালের প্রমাণ মেলার পর প্রায় ২৫ হাজার মামলা দায়ের এবং শতকোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এরপরও দেশে ভেজালের কারবারে যে কোনো হেরফের ঘটেনি এর বড় প্রমাণ বাজারে সয়াবিনের নামে অবাধে পাম অয়েল বিক্রি। মূলত বাজার তদারকির কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ার কারণেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এর সুবিধা নিচ্ছে। সয়াবিনের নামে বাজারে পাম অয়েল বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করাসহ ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, এটাই প্রত্যাশা।










































