বিশেষ সম্পাদকীয়।।
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই বিশাল এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে মোড়েলগঞ্জ থানা কার্যত চাপে ন্যুব্জ। একটি থানার ওপর এমন বিশাল দায়িত্ব বর্তানো কোনোভাবেই কার্যকর বা বাস্তবসম্মত নয়-এ কথা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক পরিবর্তন এবং অপরাধের বহুমাত্রিকতা বিবেচনায় একটি থানার সক্ষমতারও একটি সীমা রয়েছে। অথচ মোড়েলগঞ্জের বাস্তবতা সেই সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। মাদক, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, পারিবারিক সহিংসতা-এসব অপরাধের বিস্তার শুধু আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতাই নয়, বরং প্রশাসনিক অপ্রতুলতারই প্রতিফলন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা। খরস্রোতা পানগুছি নদী এই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। নদীর উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়টি ইউনিয়ন—দৈবজ্ঞহাটী, বলইবুনিয়া, হোগলাপাশা, বনগ্রাম, রামচন্দ্রপুর, চিংড়াখালী, পুটিখালী, পঞ্চকরণ ও তেলিগাতী—বাস্তবে প্রশাসনিক সেবা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
এই ইউনিয়নগুলোর মানুষের জন্য থানায় যাওয়া মানেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, নদী অতিক্রম করা এবং সময় ও অর্থের অপচয়। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হয়, যা একটি সভ্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন বাস্তবতায় প্রস্তাবিত ‘সেলিমাবাদ থানা’ কেবল একটি নতুন প্রশাসনিক ইউনিট নয়—এটি একটি প্রয়োজনীয় সংস্কার, একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তা, সেবা প্রাপ্তি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এই থানার বিকল্প নেই।
উল্লেখযোগ্য যে, স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে সচেতনতা ও আন্দোলন গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দাবিকে সামনে নিয়ে আসছেন। এটি প্রমাণ করে—এই দাবি কোনো ব্যক্তিগত বা সাময়িক নয়, বরং একটি গণদাবি, একটি সময়োপযোগী প্রয়োজন। সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সুষম উন্নয়ন ও কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করেছে, তারই অংশ হিসেবে মোড়েলগঞ্জের এই বাস্তব সমস্যার দিকে জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন। সেলিমাবাদ থানা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, অন্যদিকে মানুষের প্রশাসনিক সেবা প্রাপ্তি সহজ হবে।
এখন সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দীর্ঘসূত্রতা নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ, একটি অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার কোনো বিলম্ব সহ্য করে না। সরকারের কাছে আমাদের সুস্পষ্ট আহ্বান-মোড়েলগঞ্জের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত সেলিমাবাদ থানা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না, বরং মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।











































