হুমায়ূন কবির রানা।।
এস কে ইফতেখার মোহাম্মদ উমায়ের খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার বিভাগীয় উপ পরিচালক ও প্রধান আকবর আলী। পেশায় খুলনা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এর সঠিক তথ্য উপাত্ত উদঘাটন ও মাদকসহ কারবারিদের আটক করা তাদের কাজ হলেও উল্টো মাদক কারবারিদের সঙ্গে রয়েছে তাদের গভীর আঁতাত। প্রতিমাসে তারা নেন মাসোহারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য ও অভিযোগ রয়েছে। উঠে এসেছে তাদের নানা অভিযোগের ফিরিস্তি। খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এখন সর্ষের ভিতর ভুত বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি বয়রা ১ নম্বর সড়কের আলমগীর, কামাল ও সাত্তারদের বাড়িতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা প্রধান এস কে ইফতেখার মোহাম্মাদ উমায়েরের নেতৃত্বে একটি টিম মাদক উদ্ধারের জন্য কথিত এক অভিযান চালায়| এ সময় তাদের মিথ্যা ও অনৈতিক কথিত মাদক কারবারের অভিযোগের প্রতিবাদ জানায় ভুক্তভোগীরা স্থানীয়রা|
এ ঘটনা বেগতিক দেখে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার প্রধান উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে তাদের উপর হামলা ও আটকিয়ে রাখার মিথ্যা তথ্য দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশের সহয়তায় কিছু টাকাসহ মাদক উদ্ধারের একটি অভিযোগ দাখিল করে তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়| মামলায় তাদের উপর হামলা ও আটকিয়ে রাখার অভিযোগও দেওয়া হয় খালিশপুর থানায়|
ভুক্তভোগী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজনসহ স্থানীয়রা অভিযোগ করেন খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এই সংস্থায় কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এ ধরনের কথিত নাটক সাজিয়ে কিছু নিরপরাধ মানুষকে যেমন নাজেহাল করছে তমনি প্রকৃত মাদক কারবারিদের মাঝে আগাম অভিযানের খবর প্রচার করে নিয়মিত মাসেহারা নিচ্ছে তাদের নিকট থেকে| এ ধরনের একাধিক লিখিত অভিযোগ রয়েছে|
সুত্রের অভিযোগ একাধিকবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ দেয়া হলেও তা ধামাচাপা দেয়া হয়| একটিরও কোন সঠিক তদন্ত বা বিচার হয়নি বলেই এই সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে|
উপপরিদর্শক আকবর আলী খুলনার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন| মাদকসহ গ্রেফতার করলেও মামলা না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে তিনি ছেড়ে দেন| এমনকি সেই শর্তে মাসোহারাও নেন আকবর আলী| প্রতিমাসে ৩-৪ লাখ টাকা তিনি বিভিন্ন মাদক কারবারির কাছ থেকে আদায় করেন| অনেক মাদক কারবারিকে ব্যবহার করে তিনি অন্যদেরকে ভয়ভীতিও দেখান| একাধিক তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, নগরীর নতুন বাজার, দৌলতপুর, ফুলবাড়িগেট, আফিলগেট, রুপসা স্ট্যান্ড রোড বাজার, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকা, বার্মাশীল রোড এলাকা, লবনচরা, টুটপাড়া, রুপসা উপজেলা, বটিয়াঘাটা উপজেলা, পাইকগাছা উপজেলা, মিস্ত্রিপাড়া এলাকা এবং রুপসা ব্রিজসহ একাধিক পয়েন্টের মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন আকবর আলী| এমনকি অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য সেসব কারবারিদের দিয়ে বিক্রিও করান তিনি| প্রায় চার মাস আগে এক লাখ টাকার বিনিময়ে বটিয়াঘাটা উপজেলার একজন মাদক কারবারিকে ছেড়ে দেন আকবর আলী| অভিযোগ করা হয় জেলা ও বিভাগীয় কার্যালয়ে| তার কোন তদন্ত বা সঠিক বিচার হয়নি অদ্যবধি|
খুলনার মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র বলছে, ’গত ২৫ মার্চ উপপরিদর্শক আকবর আলী খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মাদক কারবারি মুকুল কুমার গাইনের বাসায় অভিযান পরিচালনা করেন| এসময় ৮৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হলেও মামলায় দেখানো হয় মাত্র ১০ বোতল ফেনসিডিল| এমনকি মাদক কারবারির বাসা থেকে পাওয়া আড়াই লাখ টাকা জব্দ না করে নিজেই হাতিয়ে নেন| নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা ডিএনসির একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অপরাধ কেউ একা করতে পারে না| অবশ্যই আকবর আলীকে কেউ শেল্টার দিচ্ছেন| দীর্ঘদিন ধরে উপ-পরিচালকের নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা উঠাচ্ছেন আকবর আলী| অনেক সময় তিনি মাদক উদ্ধার করে মামলাও করেন না| বিষয়টা ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে|’
অভিযুক্তর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারি বলেন, ’আমরা ছোট চাকরি করি| পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি আর করতে পারবো না|’
খুলনার মানবাধিকার সংস্থার এড. মোমিনুল হক বলেন, ’খুলনায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে| তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এবং পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফিলতি ও সহযোগিতায় মাদকের এই ভয়াল বিস্তার ঘটেছে খুলনাজুড়ে| কিছু ভালো মানুষকেও আবার মিথ্যা মাদক মামলায় জড়িত করছে| ফলে এতে করে সমাজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন| এ ঘটনায় সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান এই মানবাধিকার নেতা|’
খুলনার নাগরিক সমাজের নেতা এড. বাবুল হাওলাদার বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বেশীর ভাগই মাদক উদ্ধারের নামে অবৈধভাবে অর্থ বাণিজ্য করা এখন এই সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছে অনিয়মই এখন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে|
তিনি আরও বলেন, পাইকাগাছায় এর আগে একবার অভিযান চালানোর সময় আকবর আলীসহ কয়েকজনকে আটকে রাখেন এলাকাবাসী| বিষয়টি পরে খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. আহসানুর রহমানকে জানালে তিনি আকবর আলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন| কিন্তু সে নোটিশও পরে ধামাচাপা পড়ে যায়|অভিযোগের বিষয়ে উপ-পরিদর্শক আকবর আলী বলেন, একটা টাকাও আমি খাইনি| আর ১০ বোতলের বেশি ফেনসিডিল উদ্ধার হয়নি| তিনি আরও বলেন, মুকুল কুমার গাইনের বাসায় কোনো টাকা উদ্ধার হয়নি| আমি কোনো জায়গা থেকে টাকা-পয়সা তুলি না|
খুলনা বিভাগের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ইতিপূর্বে করা হলেও তার কোন তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি অদ্যবধি| যার কারনে সম্প্রতি মাগুরায় গত রবিবার এক কথিত মাদক উদ্ধারের নামে নির্যাতন করে একজনকে মেরে ফেলেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কতিপয় সদস্য| একপর্যায়ে সমগ্র এলাকাবাসী তাদের ঘেরাও করে আটকে রাখে| পরবর্তীতে তারা ক্ষমা চেয়ে কোন রকমে জীবনে রক্ষা পেয়েছে| এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটাচ্ছে এই সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারীরা| অভিযোগ পাওয়া সত্বেও অধিদপ্তরের খুলনার উপ পরিচালক রয়েছেন নিরব ভুমিকায়| সচেতন মহল ও নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, সর্ষের ভিতর ভূত থাকলে সেই ভুত তাড়াবে কে| খুলনার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন অভিজানের নামে চালাচ্ছে নির্যাতন আর অর্থ বানিজ্য|
অভিযুক্ত এস কে ইফতেখার মোহাম্মদ উমায়ের ও আকবর আলী পৃথক পৃথক ভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন| কিন্তু ভুক্তভোগী ও খুলনার সচেতন মহল এর সঠিক তদন্ত করে বিচারের দাবিসহ অভিযুক্তদের অপসারনের দাবি জানিয়েছেন|
খুলনা জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মলয় ভূষন চক্রবর্ত্তী বলেন, ’লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো|’











































