শাহ তানভীর আহমেদ।।
খুলনা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে ইদানীং এক অদ্ভুত ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র দেখা যাচ্ছে। নগরীর ব্যাটারিচালিত রিকশার প্যাডেলে এখন আর কোনো চালক পা রাখেন না; বরং চালকরা অভিনব ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে হ্যান্ডেলের কাছাকাছি পা রাখার বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করে আয়েশ করে গাড়ি চালাচ্ছেন। অপরদিকে, ব্যাটারিচালিত ভ্যানগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। ভ্যানের মূল চালকের সিটে আজকাল কোনো চালকই বসেন না।
তারা সিট ছেড়ে ভ্যানের একদম পাশে (বডি বা কাঠামোর ওপর) বসেই একহাতে হ্যান্ডেল ধরে অভিনব কায়দায় ভ্যান চালাচ্ছেন। চালকদের এমন খামখেয়ালি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টের কারণে নগরীতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা। অথচ সড়কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ এই প্রকাশ্য অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা যেন দেখেই দেখছে না। সচেতন মহলের অভিযোগ, নগরীর ট্রাফিক আইন যেন এখন শুধুমাত্র মোটরসাইকেল চালকদের আটকে মামলা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
রিকশা-ভ্যানে ঝুঁকিপূর্ণ ‘স্টাইল’: সরেজমিনে নগরীর শিববাড়ী মোড়, সোনাডাঙ্গা, রয়েল মোড়, দৌলতপুর ও রূপসা ঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিন চাকার এই যানগুলোর প্রায় শতভাগই এখন ব্যাটারিচালিত মোটরে চলে। ফলে চালকদের আর কষ্ট করে প্যাডেল মারতে হয় না। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে চালকদের বসার ভঙ্গি নিয়ে। রিকশাচালকরা সিটে বসে দুই পা সোজা করে হ্যান্ডেলের সমান্তরালে বা ঠিক নিচে বানিয়ে নেওয়া বিশেষ রডে পা তুলে রাখছেন। এতে কোনো জরুরি মুহূর্তে বা পথচারী সামনে চলে এলে তাৎক্ষণিক ব্রেক কষা কিংবা রিকশার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া চালকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, মালবাহী বা যাত্রীবাহী ভ্যানচালকদের অবস্থা আরও মারাত্মক। তারা মূল সিটটি ফাঁকা রেখে ভ্যানের ডান বা বাম পাশে ঝুলে বসেন। এক হাত দিয়ে কোনোমতে হ্যান্ডেল ধরে দ্রুতগতিতে গাড়ি ছোটান। অনেক সময় অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই ভ্যানের পাশে চালক এভাবে বসে থাকার কারণে মোড় নেওয়ার সময় ভ্যান উল্টে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।
ক্ষুব্ধ যাত্রী ও পথচারীরা: নগরীর কয়েকজন নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই রিকশা বা ভ্যানগুলোতে উঠলে এখন সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়। চালকরা যেভাবে হাত-পা ছড়িয়ে বা সিট ছেড়ে পাশে বসে গাড়ি চালায়, তাতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। একটু উঁচু-নিচু রাস্তায় বা স্পিডব্রেকারে এলেই এরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।” শুধু যাত্রী নয়, এদের এই বেপরোয়া ও দায়হীন গাড়ি চালানোর কারণে সাধারণ পথচারীরাও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগের তির ট্রাফিক পুলিশের দিকে: সড়কের এই চরম নৈরাজ্য চোখের সামনে ঘটলেও ট্রাফিক বিভাগ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে নগরবাসীর মনে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশের সমস্ত তৎপরতা যেন শুধু মোটরবাইক আরোহীদের ঘিরেই।
হেলমেট, লাইসেন্স বা কাগজের সামান্য এদিক-ওদিক হলেই যেখানে মোটরসাইকেল চালকদের বড় অঙ্কের জরিমানা ও মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেখানে চোখের সামনে রিকশা ও ভ্যানচালকদের এমন জীবনঘাতী আইন অমান্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই যানগুলোর চালকরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সচেতন মহলের দাবি: নগরীর বিশিষ্ট নাগরিক ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্যহীনভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। শুধু মোটরসাইকেলকে টার্গেট না করে, সড়কের প্রধান শৃঙ্খলা রক্ষায় এই ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের বিপজ্জনক বসার পদ্ধতি এবং এদের বেপরোয়া গতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ট্রাফিক বিভাগ যদি দ্রুত এই অভিনব ও ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল বন্ধে কঠোর অভিযান শুরু না করে, তবে আগামীতে নগরীর সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।










































