আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
জাপানের কয়েকটি প্রদেশে শক্তিশালী টাইফুন দুজুয়ানের প্রভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রবল বাতাস, ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং চারজন নিখোঁজ রয়েছে।
বিবিসি জানায়, নিখোঁজ চারজনই কানাগাওয়া প্রদেশের বাসিন্দা। তাদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা আগে সতর্ক করে জানিয়েছিল, টাইফুনটি মানুষের জীবনের জন্য ‘তাৎক্ষণিক বড় হুমকি’ তৈরি করতে পারে।
পরে কয়েকটি এলাকার আবহাওয়া সতর্কতার মাত্রা কমানো হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে এবং আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত দেখার পরামর্শ দিয়েছে। টাইফুনের প্রভাবে জাপানের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। প্রবল বাতাসে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় রেল চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। দুজুয়ানের সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার ছিল। ঝোড়ো বাতাসের সর্বোচ্চ গতি উঠেছিল ঘণ্টায় ১৯৪ কিলোমিটার পর্যন্ত। টাইফুনের প্রভাবে ভূমিধসেও প্রাণহানি হয়েছে।
ইয়োকোসুকা শহরের দমকল বিভাগ জানিয়েছে, ষাটের কোঠায় বয়সী এক নারী ভূমিধসের পানিতে ভেসে গিয়ে মাটির নিচে চাপা পড়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল তল্লাশি চালিয়ে একটি বাড়ির ভেতর থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করে। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে এনএইচকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চিবা প্রদেশের সোদেগাউরা শহরেও ভূমিধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় দমকল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চাশের কোঠায় বয়সী ওই ব্যক্তি ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকায় ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছিলেন। এ সময় তিনি একটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনার কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত করছে। এদিকে কানাগাওয়া প্রদেশের দমকলকর্মীরা জানিয়েছেন, এক ব্যক্তি ফোন করে তার বাড়ি ভূমিধসে ধসে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
দুজুয়ান এ বছর জাপানে আঘাত হানা ২৫তম টাইফুন। পাঁচ দিনের ছুটির সময় এটি দেশটিতে আঘাত হানে। টাইফুনের কারণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। সোমবার রক ইন জাপান সংগীত উৎসবের কয়েকটি কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। আবহাওয়ার কারণে সেগুলো বাতিল করা হয়। একইভাবে টোকিও গেম শোতে সোমবারের নির্ধারিত অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে। এটি ভিডিও গেমের একটি বড় প্রদর্শনী ও সম্মেলন। টাইফুনে প্রাণহানির ঘটনায় শোক জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তবে টাইফুনের পরিস্থিতির মধ্যেও নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। তাকাইচি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে তিনি প্রধান মন্ত্রিপরিষদসচিব তাকেহারা এবং মন্ত্রী হোসোনোকে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বিমানে ওঠেন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এ সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
টাইফুন দুজুয়ান প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া একাধিক ঝড়ের সর্বশেষটি। আবহাওয়াবিদদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়লে ঝড় আরো বেশি শক্তি পেতে পারে। এর ফলে ঝড়ের বাতাসের গতি বাড়তে পারে এবং ভারি বৃষ্টির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। তাই উষ্ণ সমুদ্রের ওপর তৈরি হওয়া ঝড়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে টাইফুনের মোট সংখ্যা বাড়ছে—এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। কিছু অঞ্চলে বরং এ ধরনের ঝড়ের সংখ্যা কমতে পারে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া কিছু টাইফুন গড়ে আরো শক্তিশালী হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ বছর এল নিনোও আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলছে। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত ঘটনা। এর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের কিছু অংশের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে যায়।
এল নিনোর কারণে মোট কতটি টাইফুন তৈরি হবে, তা স্পষ্টভাবে বলা যায় না। তবে এটি টাইফুন কোথায় তৈরি হবে, কতটা শক্তিশালী হবে এবং কোন কোন দেশের দিকে এগিয়ে যাবে, তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে এল নিনোর সময় জাপান আরো শক্তিশালী টাইফুনের মুখে পড়তে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। টাইফুন দুজুয়ান এখনো জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এর কারণে নতুন করে কোথাও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ। টাইফুনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র মঙ্গলবারের আগে পাওয়া নাও যেতে পারে।











































