মো: সোহাগ বিশ্বাস, দিঘলিয়া
গ্রাম বাংলার ফসলি জমি থেকে শুরু করে ঝোপঝাড়—সবখানেই একসময় মেছো বিড়াল, বন বিড়াল, শিয়াল, বেজি আর গুইসাপদের রাজত্ব ছিল। এরা কেবল প্রকৃতির অলঙ্কার নয়, বরং কৃষকের এমন এক পরম বন্ধু যাদের অবদানের কথা আমরা জানতেই পারি না। প্রতি বছর আমাদের দেশে ইঁদুরের কারণে যে বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়, সেই ক্ষতি রুখতে প্রকৃতি আমাদের এক শক্তিশালী ‘প্রাকৃতিক সেনাবাহিনী’ উপহার দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সচেতনতার অভাবে আমরা এই উপকারী বন্ধুদেরই চরম শত্রু মনে করে হত্যা করছি।
কৃষি সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ২ কোটি ৭ লাখ টনের বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ইঁদুরের কারণে প্রতি বছর ৫ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ফসলহানি ঘটে। গড়ে ৮ শতাংশ ক্ষতি ধরলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন ধান বিনষ্ট হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৫ হাজার ১২০ কোটি টাকারও বেশি। এক জোড়া ইঁদুর বছরে প্রায় তিন হাজার ইঁদুরের জন্ম দিতে পারে, যা দমন করতে আধুনিক কোনো প্রযুক্তি বা বিষটোপ টেকসই সমাধান দিতে পারছে না। অথচ প্রকৃতিতে বিদ্যমান খাদ্যশৃঙ্খলের নিয়ম অনুযায়ী, মেছো বিড়াল, বন বিড়াল, শিয়াল এবং পেঁচার মতো প্রাণীরা কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই বিনামূল্যে এই ইঁদুর দমনের কাজ করে যাচ্ছে। বন বিড়ালের গায়ের রং ধানের সাথে এমনভাবে মিশে থাকে যে তারা নিখুঁত ছদ্মবেশ ধরে মুহূর্তেই ফসলের শত্রু ইঁদুরকে ধরাশায়ী করতে পারে।
সৃষ্টিকর্তার এই ‘জীবন্ত রোবটগুলো’ কোনো চার্জ বা বাড়তি খরচ ছাড়াই বংশপরম্পরায় আমাদের কৃষিকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সামান্য হাঁস-মুরগি খাওয়ার অজুহাতে কিংবা নিছক ভয়ের কারণে আমরা তাদের লোকালয়ে পিটিয়ে মারছি। তার চেয়েও ভয়াবহ হলো ইঁদুর দমনের নামে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক ফাঁদ। সম্প্রতি খুলনার তেরখাদাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মরণফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে মেছো বিড়াল, গন্ধগোকুল ও খাটাশ। এই বিপজ্জনক ফাঁদ শুধু বন্যপ্রাণীই নয়, গত কয়েক বছরে কৃষক ও পুলিশ সদস্যসহ প্রায় অর্ধশত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমরা যখন ইঁদুর মারার জন্য বিষ বা কারেন্ট ফাঁদ ব্যবহার করি, তখন আসলে আমাদের অজান্তেই হাজার কোটি টাকার ফসল রক্ষা করা বন্ধুদেরই শেষ করে দিচ্ছি।
ইঁদুর দমনে সাপ, মেছো বিড়াল বা বেজির মতো প্রাণীদের বিকল্প কোনো নিরাপদ পদ্ধতি পৃথিবীতে নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইঁদুর মারার রোবট বানালেও তা কাদা-পানিতে বিকল হবে, কিন্তু এই প্রাণীরা যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখছে। অথচ মাঠ পর্যায়ে কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বা কৃষকদের মাঝে জনসচেতনতা তৈরিতে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের এই সময়ে আমাদের প্রতিটি শস্যকণা রক্ষা করা জরুরি। আর এই শস্য রক্ষার চাবিকাঠি কোনো বিষে নয়, বরং আছে মেছো বিড়াল ও বন বিড়ালের মতো পরম বন্ধুদের বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে। কৃষকের এই নীরব প্রহরীদের রক্ষা করা এখন কেবল পরিবেশের দায় নয়, বরং দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত।











































