নিজস্ব প্রতিনিধি।।
মাগুরার ইসলামপুর পাড়ার সৈয়দ আতর আলীর বাড়ির প্রবেশ মুখের সেই কাঁঠাল গাছটি এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বহন করে। ১৯৫৪ সালের দিকে প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়িটিতে এসেছিলেন। এরপর আরো অত্যন্ত দুইবার এসেছেন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছেন। তখন সৈয়দ আতর আলীর সঙ্গে রাজনীতি বিষয়ে নানা পরামর্শ করেছেন বঙ্গবন্ধু। সৈয়দ আতর আলী ছিলেন সেসময় তুখোর রাজনীতিবিদ। যুক্তিবাদী সুবক্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং সংগঠক। তার ব্যক্তিত্বের স্নেহধন্য চেতনায় অতিসহজেই নতজানু হয়ে যেত তার কাছে যে কেউ আসলেই। তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী নির্ভীক ও একজন সাহসী মানুষ। সৈয়দ আতর আলী রাজনীতিতে ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও নিষ্ঠাবান প্রকৃতির।
সৈয়দ আতর আলীর ইসলামপুর পাড়ার বাড়ির কাঁঠালতলার কাচারি ঘরে বসে কয়েকবার মিটিং করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু। সেই কাচারি ঘরটি এখন আর নেই। তবে, কাঁঠালগাছটি এখনো আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু এই বাড়িতে নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা করেন।
সৈয়দ আতর আলীর জ্যেষ্ঠপুত্র সৈয়দ আবু আসাদ টোকনের দেওয়া তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এই বাড়িতেই সূচনা হয়েছিল মাগুরা আওয়ামী লীগের। ১৯৬৬ সালে মাগুরা নোমানী ময়দানে এক জনসভায় যোগ দিতে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেসময় চিকেন পক্সে আক্রান্ত হওয়ায় সে জনসভায় যোগ দিতে পারেননি আব্বা, (সৈয়দ আতর আলী)। তার অসুস্থতার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু নিজেই ছুটে আসেন এই বাড়িতে। তখন পক্স হলে কেউ কারো ধারে কাছে যেত না। তবে, সত্যিই শেখ সাহেব সব আশঙ্কা দূর ঠেলে আমাদের গেটে এসে ডাকতে লাগলেন, ‘বুড়ো মিয়া’, ‘বুড়ো মিয়া’ বলে। তিনি আব্বাকে সবসময় ‘বুড়ো মিয়া’ বলে ডাকতেন। আব্বার বিছানায় গিয়ে বসে সেদিন তিনি আব্বাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেদিন কাঁঠালতলায় আমাদের কাচারি ঘরে বসে তিনি মিটিং করলেন এবং আব্বাকে বললেন, ‘বুড়োমিয়া’ আপনি শুয়ে শুয়েই সভাপতিত্ব করেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ এর নির্বাচনের সময় তিনি এ অঞ্চলে প্রচারণার জন্য আসেন। সেবারও আমাদের বাড়িতে এসে নিজেই কাঁঠালতলায় কিছুক্ষণ বসেন। আমরা তাকে নিয়ে বেবিট্যাক্সিতে করে প্রচারে বেরিয়ে যাই। আমার খুব মনে পড়ে মহম্মদপুরে আমাদের বেবিট্যাক্সি বন্ধ হয়ে যায়। কিছুতেই যখন স্টার্ট নিচ্ছিল না তখন বঙ্গবন্ধু নিজে নেমে গাড়ি ঠেলতে থাকেন এবং যথারীতি গাড়ি স্টার্ট নেয়। বিজয়ীর হাসি দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘দেখেছিস পিঁপড়ার বড় বল’।
মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সব আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সৈয়দ আতর আলী। মুক্তমনের একজন মানুষ হিসেবে, আজন্ম বাঙালি হিসেবে তিনি বঙ্গবন্ধুর সারথী হয়েছিলেন তারুণ্যেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করেই পথ চলেছেন। সেই পথ চলতে গিয়ে তার ত্যাগ, অবদান অসামান্য। জীবনের শেষ দিনটিও ছিলেন দেশের জন্য নিবেদিত। রাজনীতি দিয়ে তিনি মানুষকে আপন বন্ধনে বাঁধতে পেরেছিলেন। তার রাজনৈতিক শক্তি ছিল অপরিসীম। তার সততা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস-তার রাজনৈতিক জীবনকে কেবলই মহিমান্বিত করেছে। ভীষণ রকম গণমুখি মানুষ ছিলেন তিনি। চলার পথে শত মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। কুশলবিনিময় করতেন, তিনি কখনোই পেশি শক্তি ও মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি। ধনী-দরিদ্র কোনো ভেদাভেদ ছিল না তার। বরং দরিদ্র মানুষের সংসারের খোঁজখবর তিনি একটু বেশিই রাখতেন। আর এ কারণেই দরিদ্রজনের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সাধ্যমত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন। রাজনীতি করেছেন সেবা আর ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত সামনে রেখেই। বিত্তবৈভব তাকে কখনোই আকৃষ্ট করেনি।
সৈয়দ আতর আলী ছিলেন সেসময় মাগুরা মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। দলকে সংঘটিত করতে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণে অনেকেই এসে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে সমবেত হয়েছেন। প্রায় সারাদিনই তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সেসেময় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে উঠেছিল ইসলামপুর পাড়ার কাঁঠাল তলার বেড়া দেওয়া ও শনের ছাউনি দেওয়া সেই কাচারি ঘরটি।
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর ৭ মার্চের ভাষণের নিদের্শ মোতাবেক মাগুরায় সৈয়দ আতর আলী, সোহরাব হোসেন ও আছাদুজ্জামানের সঙ্গে একযোগে অসহযোগ আন্দোলন বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনাদের অতর্কিত হামলা ও নির্বিচারে গণহত্যার ঘটনায় পরদিনই মাগুরায় প্রতিরোধ যুদ্ধ সুসংগঠিত করতে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মাগুরা নোমানী ময়দান সংলগ্ন আনছার ক্যাম্পেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ক্যাম্প খোলা হয়। এখান থেকে মাগুরা এলাকার প্রতিরোধ যুদ্ধের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তার বক্তৃতা ছিল চমৎকার শিল্প শৈলীতে ভাষ্কর। বঙ্গবন্ধুর ১৯৬৬ সালের ৬ দফার দাবি বাস্তবানের জন্য বাইসাইকেলে তিনি জেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে, হাটে-বাজারে মানুষের কাছে গিয়ে প্রচার করেছেন। ৬ দফার মূল কথাগুলো সাধারণ মানুষের উপযোগী ভাষায় ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে তিনি মাগুরার মানুষের সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের ‘পলিটিক্যাল কনভেনর’ হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি ছাত্র-যুবসমাজকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে কাজ করেছেন প্রতিনিয়ত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি ভারতের বনগাঁয় বাংলাদেশ মিশনের একটি শাখার দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি স্বাধীনতার জন্য মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। একজন সৎ, যোগ্য, দায়িত্বশীল ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন সৈয়দ আতর আলী।
স্বাধীনতার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেও তিনি স্বাধীনতার লাল রক্তিম সূর্যটাকে দেখে যেতে পারেননি। রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আতর আলী পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কল্যাণী জওহরলাল নেহেরু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর গভীর রাতে তিনি পরলোক গমন করেন। যশোর জেলার শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদের সঙ্গে ঘুমিয়ে আছেন রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতন সংগঠক সৈয়দ আতর আলী। আজও মাগুরার আপামোর মানুষের কাছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মানুষ তিনি।











































