দখলবাজির অভিযোগে সংরক্ষিত আসন ও দলীয় পদ হারালেন বিএনপির মিষ্টি: রাজনৈতিক অঙ্গনে কঠোর বার্তা
ঢাকা অফিস।।
স্বামী কাউন্সিলর ছায়েদুর রহমান নিউটন হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিএনপিতে সহানুভূতি ও ত্যাগী নেত্রী হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে আসছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়িয়ে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে আইনসভাতেও পা রেখেছিলেন তিনি। তবে রাজধানীর মিরপুরে পাঁচ দশকের পুরোনো একটি জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি দখলের অপচেষ্টা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় নাম আসার পর দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের চরম অসন্তোষের মুখে তাঁকে সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হলো। একই ঘটনায় তাঁর নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরবর্তীতে সংসদ সচিবালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর (সংরক্ষিত নারী আসন-২৩) আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। মার্চ মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরুর পর এটিই কোনো সংসদ সদস্যের পদত্যাগের প্রথম ঘটনা।
যে ঘটনার জেরে আসন হারালেন মিষ্টি:
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে। মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লকে সুইডিশ সংস্থার সহায়তায় দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে পরিচালিত ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি’ নামের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাকা ও সেমিপাকা ভবন হঠাৎ বুলডোজার ও হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় একদল দখলদার। ১০ কাঠা জমিতে অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ধ্বংসের পরপরই সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইন বোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, উক্ত সমিতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মিষ্টি।
সমিতিতে পদ থাকার কথা স্বীকার করলেও হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আসছিলেন মিষ্টি। তবে পাঁচ দশকের পুরোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন তাণ্ডব ও দখলদারিত্ব নিয়ে ঢাকাজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশ:
ঘটনার সময়ে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউ ইয়র্ক সফরে ছিলেন। দেশে ফেরার পরপরই বিষয়টি জানতে পেরে তিনি চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং সরকারি জমিতে দখলবাজি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশেই বৃহস্পতিবার সকালে মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। এর পরপরই তিনি জাতীয় সংসদ ভবনে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পদ থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে পুরো কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পরিচিতি ও ভবিষ্যৎ বার্তা:
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নব্বইয়ের দশকে বদরুন্নেসা কলেজ ছাত্রদলের নেত্রী ও এজিএস ছিলেন। তাঁর ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাবেক এমপি। ২০০২ সালে মিষ্টির স্বামী কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা ও কাউন্সিলর ছায়েদুর রহমান নিউটন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর মিষ্টি রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা মিষ্টির বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে অন্তত ২০টি মামলা হয়েছিল।
তবে ত্যাগের রাজনৈতিক ইতিহাস থাকলেও মিরপুরের বিতর্কিত ঘটনার পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এই তড়িৎ পদক্ষেপকে দখলবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং স্পষ্ট কঠোর বার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শূন্য হওয়া এই সংরক্ষিত আসনটিতে এখন নতুন করে উপনির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।











































