Home সম্পাদকীয় শহরমুখী মানুষের ঢল : দরিদ্রতা বাড়ছে: স্বস্তি দেয়ার মতো উদ্যোগ নেই

শহরমুখী মানুষের ঢল : দরিদ্রতা বাড়ছে: স্বস্তি দেয়ার মতো উদ্যোগ নেই

26

বাংলাদেশে দরিদ্রতা কোন অবস্থায় রয়েছে সেটা জানার সুযোগ কম। নির্ভর করা যায় এমন জরিপ নেই। সরকারের হিসাবে অসচ্ছল নিম্ন আয় ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা প্রবল। ফলে এই সরকারের আমলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা জরিপের ফলের সাথে মাঠের পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায় না। গ্রামের নিভৃত পল্লী হাট-বাজার, শহরের বস্তি ও জনাকীর্ণ স্থানে আগন্তুকের আনাগোনা থেকে কিছু অনুমান করা যায়। লাগামহীন দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশ চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। বিপুল মানুষ নিত্যপণ্য ক্রয় করার ক্ষমতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া গ্রামের মানুষের শহরমুখী স্রোত আবারো দেখা যাচ্ছে। তারা ভাসমান হয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা নিচ্ছে।
দুটো আলাদা বেসরকারি সংস্থা ‘নগর দারিদ্র্য’ নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ২৪ শতাংশের বেশি গ্রামীণ পরিবার শহরমুখী। এর পেছনের কারণটা জরিপ-পরবর্তী গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট করা হয়নি। এই ধরনের প্রবণতার পেছনে জীবযাত্রার ব্যয় আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়াই মূল কারণ তা অনুমান করা যায়। তারা শহরে এসে বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভাসমান থেকে সঙ্কট সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এক সেমিনারে জরিপ পরবর্তী গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। দেশের ৮টি সিটি করপোরেশন ও ৮টি পৌরসভায় ৪৮০টি পরিবারের ওপর তারা জরিপটি চালায়। তাদের হিসেবে নগর দারিদ্র্য ৪০ শতাংশ। বস্তিবাসীদের ৮২ শতাংশ খাদ্য অনিরাপত্তায় ভোগে। এদের ৯৪ শতাংশ ভূমিহীন।
বস্তিতে বসবাসের অস্বাস্থ্যকর ও কষ্টকর ঘিঞ্জি পরিবেশের বিষয় উঠে আসে জরিপে। দেখা যাচ্ছে, ছোট একটি ঘরে পরিবারের সব সদস্যকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। মাত্র ১৬ শতাংশের নিরাপদ স্যানিটেশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা আছে। এদের শিক্ষা চিকিৎসার অবস্থা আরো করুণ। পরিবারের ৪১ শতাংশের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। অসুস্থ হলে ৬৪ শতাংশ স্থানীয় ফার্মাসি থেকে চিকিৎসা নেয়। বাকিরা উপযুক্ত চিকিৎসা পাচ্ছে এমন জানা গেল না। এদের মাত্র ৫ শতাংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে।
তার পরও এরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এর জন্য গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামে কাজের সুযোগ না থাকা ও কৃষির উৎপাদন সঙ্কট। বর্তমান সরকারের সময় অব্যবস্থাপনায় সামগ্রিক অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে পণ্যমূল্য সিন্ডিকেট। নিম্ন আয় ও দরিদ্র মানুষেরা তিনবেলা খাওয়া ও মাথা গোঁজার ঠায় পেলেই সন্তুষ্ট। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধস তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তাকে টলিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে কোনো রকমে বেঁচে থাকতে চাচ্ছে। এই গবেষণার তথ্য-উপাত্তও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বস্তির পরিবারগুলোর গড় বার্ষিক আয় বছরে দেড় লাখ টাকার বেশি। তাদের ৬৮ শতাংশ গ্রামে থাকা স্বজনদের কাছে টাকা পাঠান। ভাসমান জীবনযাপন করে এরা সামান্য একটু অর্থ আয় করে তা আবার গ্রামে থাকা আত্মীয়দের পাঠিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে অবদান রাখছে।
জরিপ করা হয়েছে গত বছরের মে ও জুলাই মাসে। গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যমূল্য দুটোই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এর বিপরীতে মানুষের আয় কমেছে, কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হয়েছে। এ অবস্থায় সারা দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এমনকি গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের ঢলও বেড়েছে। এ সঙ্গিন অবস্থা মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেই।