Home কলাম নাট্য মহারথী আলী যাকের

নাট্য মহারথী আলী যাকের

12

-মলয় বিকাশ দেবনাথ

গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশ বরেণ্য শিল্পানুরাগী, এশিয়াটিক থ্রি সিক্সটি গ্রুপের চেয়ারম্যান, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি, যুক্তরাজ্যের রয়েল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নাট্যজন আলী যাকের। ২০২০ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে এক অভিশপ্ত বছর। সারা বিশ্বে যে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে তাতে একটি প্রজন্ম প্রায় নিঃশেষের পথে। এ শূন্যতা অপূরণীয়। আলী যাকের এমনই একজন ব্যক্তি গুণের যে তার নাইকো শেষ। ১৯৬৯ সালে এশিয়াটিকে চাকরি নিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরলেন। এরপর ১৯৭১ সালে সারাদেশ যখন উত্তাল আলী যাকের ভারতে চলে যান যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। সেখানে প্রশিক্ষণ নেয়ার পরপরই দেখা হয় চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবিরের সঙ্গে। তখন আলমগীর কবির বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধের মতোই জরুরী হলো প্রচারযুদ্ধ। বিশ্ববাসীকে বোঝাতে হবে আমরা ন্যায়যুদ্ধ করছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা ইংরেজী সার্ভিস শুরু করছে, লেগে যাও।’ শুরু করে দিলেন প্রচারণা, হয়ে উঠলেন শব্দসৈনিক। আমাদের এই মহান শব্দসৈনিক বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে গত ২৭ নবেম্বর ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এসেছিল। ৭৬ বছর বয়সী এ অভিনেতা ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে। আলী যাকের ছিলেন চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। তার বাবা মোহাম্মদ তাহের ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। সরকারী চাকরির জন্য তাদের থাকতে হয়েছিল দেশের নানা প্রান্তে। সেন্ট গ্রেগরি থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন নটরডেম কলেজে। এইচএসসির পর সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী নেন। ছাত্র অবস্থায় যুক্ত হন রাজনীতিতে, করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। স্নাতক শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে চলে যান করাচী। সেখানেই প্রথম নাটকে অভিনয় করেছিলেন। নাট্য জগতে তার অবদান লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে ক’জন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তার মধ্যে তিনি অন্যতম। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ যেখানে মৌলিক চাহিদার পর্যাপ্ত সংকুলান নেই সেখানে শিল্পচর্চা যে কতটুকু কষ্টসাধ্য এটা সহযেই অনুমেয়। এই প্রতিকূলতার মধ্যে শুধুমাত্র মনের জোড়ে এবং নাটকের প্রতি তীব্র ভালবাসায়, শিল্পের টানে নাট্যচর্চা শুরু করেন। আলী যাকের দেশে ফিরে আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক দিয়ে স্বাধীন বাংলায় প্রথম অভিনয় করেন। সে বছরেরই জুন মাসে তিনি মামুনুর রশীদের সঙ্গে কথা বলে জিয়া হায়দারের নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। সভাপতি জিয়া হায়দারের সঙ্গে আতাউর রহমান ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। তখন থেকে নাগরিকই তার ঠিকানা।

বাংলাদেশে নাট্যচর্চাকে বেগবান করার লক্ষ্যে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক নাটকের চিন্তাটা প্রথম আসে আলী যাকেরের মাথায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলে বাকি ইতিহাস নাটকটি তিন সন্ধ্যার জন্য বুকিং দেয়া হয়। আলী যাকের বললেন, পরের সপ্তাহেও বুকিং দিই। অনেকেই অমত করলেও তিনি বন্ধের দিন রোববার পরপর আট সপ্তাহ বুকিং দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। প্রথম শোতে এসেছিলেন ৩৫ জন দর্শক। দ্বিতীয় শো থেকেই হাউসফুল। এর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল নাটকের দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হয়েছিল। বেল পড়ার পর আর পর্দা নামে না, একবারেই পুরো নাটক শেষ হয়ে যেত। এ অভিজ্ঞতা দর্শকের ছিল না। এরপর ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে তাদের মিলনায়তনে নাটক করতে নিষেধ করে দেয়া হয়। এরপর মহিলা সমিতির মঞ্চ খুঁজে বের করে নাটকটির শো চলমান রাখা হয়।

বাকি ইতিহাস ছাড়াও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেন সৎ মানুষের খোঁজে, গ্যালিলিও, দেওয়ান গাজীর কিস্সা, কোপেনিকের ক্যাপ্টেন, ম্যাকবেথ ইত্যাদি নাটকে। অভিনেতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন গুণী নাট্য নির্দেশক । ছোট পর্দায় অভিনয় করেও তিনি বাংলার মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। আরেক গুণী নাট্যকার, কবি, লেখক হুমায়ূন আহমেদের আজ রবিবার, বহুব্রীহি, তথাপি, পাথর, দেয়ালসহ বহু নাটকে অভিনয় করে তিনি প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছেন। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্রে।

অভিনয়ের পাশাপাশি আলী যাকের লেখালেখিতেও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। তার প্রকাশিত বই হলো ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। এছাড়া টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটক লিখেছেন। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন দীর্ঘদিন।

১৯৭৭ সালে তিনি সারা যাকেরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৩ সালে সারা আমীন (সারা যাকের) নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। একবার একজন অভিনেত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানে অতি অল্প সময়ে সারা যাকের চরিত্রায়ন করে সকলের নজর কেড়েছিলেন। এরপর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশনেও নিয়মিত অভিনয় করতেন। আলী যকেরের জীবনসঙ্গীর পাশাপাশি তিনি ছিলেন নাট্যসঙ্গীও। তাদের দুই সন্তান ইরেশ যাকের এবং শ্রিয়া সর্বজয়া।

নাটকের অন্তপ্রাণ আলী যাকের সংস্কৃতি অঙ্গনে অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার। গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে পেয়েছেন মেরিল–প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা। তার কর্ম এবং অবদানকে সঠিকভাবে প্রচার করে পরবর্তী প্রজন্মকে সে শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলেই আলী যাকেরের চেষ্টা সফল হবে।

শিল্পাঙ্গন উচ্চ মাত্রায় আসীন হবে। রাষ্ট্রসহ সকল শ্রেণীর মানুষের সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আলী যাকের আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক