Home Uncategorized খুলনায় রমরমা অবৈধ প্লট-বাণিজ্য

খুলনায় রমরমা অবৈধ প্লট-বাণিজ্য

244


স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে চাকরি করেন আরিফুল ইসলাম। খোলামেলা পরিবেশে নিজের একটি বাড়ি বানানোর স্বপ্ন তার। কম দামে জমি বিক্রির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন আড়ংঘাটা মোস্তর মোড় এলাকার একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তিন কাঠা জমির বিপরীতে দুই লাখ টাকা জমা দেন তিনি। পরে কাগজপত্র যাচাই করে দেখেন, কৃষি জমি ও সরকারি খাল ভরাট করে ওই স্থানে প্লট করা হয়েছে। আর আবাসন প্রতিষ্ঠানটিরও কোনো বৈধতা নেই। ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার শঙ্কায় বহু কষ্টে বায়নার টাকা ফেরত আনেন আরিফুল ইসলাম।
জানা গেছে, খুলনা শহরতলির জিরোপয়েন্ট, রূপসা সেতুর বাইপাস সড়ক, সাচিবুনিয়া-বটিয়াঘাটা সড়ক ও খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের দুই পাশে কৃষি জমি ও সরকারি খাল-বিল ভরাট করে অধিকাংশ আবাসন প্রকল্প প্লট বিক্রির রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভরাট হওয়া সরকারি খালের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে ডুমুরিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার ২৮টির বেশি সরকারি খালের জমি বেদখল হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে খুলনা সিটি করপোরেশনের বর্ধিত অংশ লবণচরা, হরিণটানা, ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা এলাকায় জমির দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি জমি, খাল দখল করে প্লট আকারে বিক্রির ঘটনাও বেড়েছে।
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে খুলনায় কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ হেক্টর। ১২ বছরের ব্যবধানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৪ হেক্টরে। কৃষি জমি ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনুমোদনহীন আবাসন ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কারণে বছরে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আবাসন প্রকল্পে যতটুকু প্রশস্ত সড়ক থাকার কথা, তা নেই। পাঁচ-ছয় একর জমি নিয়ে ছোট ছোট আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলে প্লট বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে মার্কেট, মসজিদ, বিনোদন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গা নেই। কোনো আবাসন প্রকল্প খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) কাছ থেকে অনুমোদনও নেয়নি।
ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য
ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়ন, আড়ংঘাটা, বটিয়াঘাটা সদর ও জলমা ইউনিয়নে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। ভূমিদস্যুরা শুরুতে সড়কের পাশে আবাসন প্রকল্পের নামে কিছু জমি কেনেন। তারপর সেখানে বালু ফেলে দখলে নেওয়া হয় আশপাশের কৃষি জমিও। কৌশলে জমির মালিকদের ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করে আবাসন কোম্পানির কাছে কৃষি জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। পরে ওইসব জমিতে বালু ভরাট করে প্লট বিক্রির ব্যবসা শুরু হয়।
জানা গেছে, জিরো পয়েন্টের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রগতি আবাসন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিসের সামনে সবুজ বাংলা আবাসিক প্রকল্প, গল্লামারী এলাকায় নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা, নিজখামার এলাকায় একতা আবাসিক প্রকল্প, গ্রিন টাউন, কৈয়া বাজার এলাকায় কৈয়া আবাসিক প্রকল্প, বয়রা বাজারে নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, ও সোনাডাঙ্গা হাসানবাগ এলাকায় স্বপ্নীল আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া বয়রা বাজার এলাকায় বসতি প্রপার্টিজ, সিটি বাইপাস রোডের মোস্তফার মোড়ে মোস্তফা আবাসিক প্রকল্প, আড়ংঘাটা প্রত্যাশা, চৈতী হাউসিং প্রপার্টিজ লিমিটেড, টুটুলনগর আবাসিক এলাকা, বয়রা এলাকায় আঙিনা রিয়েল এস্টেট, বয়রা বাজারে মেসার্স সিয়াম প্রপার্টিজ ছাড়াও এআর আবাসিক প্রকল্পে জমি বিক্রি করা হচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন নর্থ খুলনা রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউসিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ১৮০। রিহ্যাবের সদস্য নয়, এমন প্রতিষ্ঠানও আছে এ খাতের ব্যবসায়।
আবাসন ব্যবসায়ী বিসমিল্লাহ প্রোপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, খুলনায় ৫-১০-১৫ বিঘা জমি কিনে প্লট করে বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে শহরের সোনাডাঙ্গার পর থেকে ডুমুরিয়া পর্যন্ত আর নিরালা আবাসিক এলাকার সঙ্গে লবণচরা জিরোপয়েন্ট, বটিয়াঘাটা এলাকায় জমির কেনাবেচা বেশি।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি আবাসন খাতে কেডিএর অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু নিয়মানুযায়ী তারা সেখানে চওড়া রাস্তা, স্কুল, মসজিদ, খেলার মাঠের জন্য যে জমি দিতে বলেন, সেটা দিতে গেলে ছোট ব্যবসায়ীদের জমিই থাকে না। এ ক্ষেত্রে কেডিএ-এর কয়েকজনকে মিলে একসঙ্গে আবাসিক এলাকা করার প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় জমি থাকায় সেটাও সম্ভব নয়।
আবাসন ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনে অনাগ্রহ
কেডিএ-এর আইন অনুযায়ী আবাসন প্রকল্পে কমপক্ষে ১২ ফুট চওড়া রাস্তা থাকতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্পেই তা নেই। আবাসন প্রকল্প ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব-খুলনার সভাপতি শেখ আবেদ আলী বলেন, কেডিএ-এর আইনে সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে হলে কমপক্ষে পাঁচ একর এবং সিটির বাইরে কমপক্ষে ১০ একর জমি থাকতে হবে। আরও থাকতে হবে খেলার মাঠ, স্কুল, উপাসনালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র। অথচ খুলনার ৬৮টি প্রকল্পের কোনোটিতেই এসব নেই।
কেডিএ-এর পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ জানান, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুযায়ী আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে প্রাথমিকভাবে উদ্যোক্তা ও পরামর্শক নিবন্ধন করতে হয়। এরপর ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর ও মূল্য সংযোজন করের নিবন্ধন নম্বর লাগে। ভবিষ্যতে এখানে বসবাসরতদের প্রয়োজনের কথা ভেবেই আবাসিক এলাকার ক্ষেত্রে চলাচলের রাস্তা চওড়াসহ নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা রাখতে বলা হয়েছে।