নাজমুল হক লাকি
হাতের আঙ্গুলগুলো সরু হতে হতে নখের কাছে গিয়ে একেবারে চোখা হয়ে গেছে! যেন লেডিস ফিঙ্গার! জ্যোতিষী হলে নির্ঘাত বলতেন, আরে এ যে শিল্পী হাত! এ হাতের মানুষটি শিল্পী না হয়েই পারে না। অন্য কোন পেশা তার জন্য নয়। শিল্পী হলেই সে নাম করবে। দেশজোড়া হবে তার খ্যাতি। সংখ্যাতত্ত্ববিদ বলতেন, জন্ম ২৯ জুলাই! মানে ২+৯=১১। ১১ যেহেতু মাস্টার নম্বর একে আর ক্ষুদ্রাংশে ভাগ না করলেও চলবে। জন্মসংখ্যা যার ১১, তাঁর আছে গভীর অন্তর্দৃষ্টি। কোন কিছু চট করে ধরে ফেলা বা বুঝে নেয়ার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নিয়ে তিনি জন্মেছেন। এরা অতি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও জন্মগত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন। আপনার অজান্তেই তিনি আপনার মনের ভাব বুঝে ফেলতে সক্ষম। অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ মানুষ।
বাতিল জ্যোতিষশাস্ত্র কিংবা খোঁড়া সংখ্যাতত্ত্ব যা-ই বলুক না কেন তীক্ষ্মবোধসম্পন্ন মানুষ সোহেল আজিজ মনে প্রাণেই একজন প্রকৃত শিল্পী। কি-বোর্ড যখন তাঁর আঙ্গুলের স্পর্শ পায়-সে এক অপরূপ দৃশ্য! পেশাদার ক্যামেরাম্যানের জুম করা লেন্সেও যা ধরা পড়ে না, সেটা হলো তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ছড়িয়ে পড়া সুরের ইন্দ্রজাল। এই সুর আপনাকে মায়াবি মায়ায় মন্ত্রমুগ্ধ কোরে রাখতে বাধ্য। খুব ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক ছিল। ব্যবসায়ী বাবাও চাইতেন ছেলে কন্ঠশিল্পী হোক।

চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ওস্তাদ ঠিক করে দিলেন বাবা। পুরাদমে শুরু হয়ে গেল ক্লাসিক্যাল মিউজিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলসঙ্গীতে তালিম নেয়া। কয়েক বছর শেখার পর ওস্তাদ বাবাকে ডেকে বললেন, সোহেল এখন রেডিওতে অডিশন দেয়ার উপযুক্ত হয়ে গেছে। অডিশন দেয়ার জন্য অ্যাপ্লিকেশন করা থেকে শুরু করে অন্যান্য সব ব্যবস্থা ওস্তাদই করে দিলেন। নির্দিষ্ট দিনে অডিশন হলো। প্রথম অডিশনেই খুলনা বেতারের এনলিস্টেড শিল্পী হিসেবে সিলেক্ট হলেন সোহেল আজিজ। তখন বেতারে নিয়মিত গান করেন আর খুলনা জিলা স্কুলের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে পড়াশোনা! এই ছিল সোহেলের জগত।
স্কুল জীবনের কথা জানতে চাইলে সোহেল আজিজ বলেন,‘১৯৮৪ সাল। খুলনা জিলা স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। জিলা স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রূপসা নদী। গণি স্যার ছিলেন আমাদের হেড স্যার। খুবই কড়া। তারপরও আমরা মাঝে মাঝে স্কুল পালাতাম। তখন স্কুল পালানোর মজাটাই ছিল আলাদা। স্কুল পালিয়ে আমরা বন্ধু-বান্ধব মিলে ফরেস্ট ঘাটে এসে বসে থাকতাম। হাতে থাকতো গিটার। তখন সবে গিটার বাজানো শিখেছি। গিটারটা আমার কাছে হয়ে গিয়েছিল নেশার মত। এমনও সময় গেছে ফরেস্ট ঘাটে বসে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গিটার বাজাতাম।’
ব্যান্ড সঙ্গীতের সাথে কিভাবে যুক্ত হলেন জানতে চাইলে বলেন,‘ব্যান্ড সঙ্গীত আমাদের কাছে ছিল উন্মাদনার মত। পপ গানের জনপ্রিয়তা সেই সময় তুঙ্গে। তখন পপ সম্রাট আজম খান, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ, ফিরোজ সাঁই, জিংগা শিল্পীগোষ্ঠী, ফিডব্যাক, মাইলস-এর গান শুনতে শুনতে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হই। আমিও স্বপ্ন দেখতাম স্টেজে উঠবো, গান গাইবো, গিটার বাজাবো, কি-বোর্ড বাজাবো! এসব ভাবতে ভাবতেই আমরা বন্ধু-বান্ধব মিলে যোগ দিলাম খুলনার অবসকিউর ব্যান্ডে। আমার বন্ধু অবসকিউর ব্যান্ডের ফাউন্ডার মেম্বার দেওয়ান হাসান ওয়াহিদ তুষার বললো-তুই যেহেতু হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে পারিস তাই তুই কী-বোর্ড আর গিটার বাজাবি। সেই ১৯৮৪ সাল থেকেই শুরু হলো আমার কি-বোর্ড বাজানো আর মিউজিক কম্পোজ করা।’
খুলনা থেকে ঢাকায় এসে মিউজিক করা এবং মিউজিশিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া-জার্নিটাতো অনেক বিস্ময়কর এবং বিশাল। এব্যাপারে কিছু বলুন। ‘বিষয়টা আসলেই বিস্ময়কর। ঢাকায় এসে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা পাবার চিন্তা তখন আমার কাছে ডিঙি নৌকা নিয়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার মতই। স্টুডেন্ট লাইফ! অবসকিউর ব্যান্ডের সদস্য হয়ে খুলনার বিভিন্ন মঞ্চে শো করি। সবাই আমার বাজানোর প্রশংসা করে-এটাই ছিল আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। তখন আমি খুলনার বিএল কলেজে পড়ি। হঠাৎ সুযোগ এসে গেল অবসকিউর ব্যান্ডের মাধ্যমে ঢাকা যাওয়ার। এভাবে খুলনা থেকে বেশ কয়েকবার গিয়ে ঢাকায় বিভিন্ন স্টেজে আমরা শো করলাম। অনেক বিখ্যাত মিউজিশিয়ানের সাথে পরিচয় হলো। তাঁরা আমাকে ঢাকায় থেকে মিউজিক করার পরামর্শ দিলেন। আত্মবিশ^াস যোগালেন। আমিও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম ঢাকা থাকার। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েই স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে এলাম।’
ঢাকা এসেই স্টুডিওতে কাজ শুরু করলেন? ‘না। শুরুতে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। বিভিন্ন স্টেজে শো করতাম। বেবী নাজনীন আপা, রিজিয়া পারভিন আপা, আমার বন্ধু পলাশ, কুমার বিশ্বজিৎ দাদা বলতে গেলে সেই সময়ের বিখ্যাত সবার সাথেই তখন স্টেজে বাজিয়েছি। সেই সময় সবাই আমাকে একটা কথাই বলতেন, মিউজিকে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে তোমাকে সেশান প্লেয়ার হতে হবে, মানে স্টুডিওর রেকর্ডিং-এর মিউজিশিয়ান হতে হবে। এ ব্যাপারে মাকসুদ জামিল মিন্টু ভাই, ফোয়াদ নাসের বাবু ভাই, মানাম ভাই, নকিব খান ভাই, লিটন ডি কস্টা-এরকম সিনিয়র ভাই যারা আছেন সবাই আমাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তারপর আমাদের ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে পুরোপুরি স্টুডিওর সেশানে ঢুকে পড়ি এবং ফ্রিল্যান্স কাজ করা শুরু করি। স্টুডিওতে কাজ করতাম আর স্টুডিওর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন শিল্পীর সাথে দেশ-বিদেশে প্রোগ্রাম করতাম। সেই সময় সাবিনা ইয়াসমিন আপা, সৈয়দ আব্দুল হাদী ভাই, এন্ড্রু কিশোর দা, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী সবার সাথেই কি-বোর্ড বাজিয়েছি। অনেক পরে আমি বাপ্পা মজুমদারের সাথে কাজ শুরু করি। এখনও তাঁর সাথেই কাজ করছি।’
সোহেল আজিজ সম্পর্কে খুব অল্প কথায় কিছুই বোঝানো যাবে না। দেশের অনেক বড় মাপের একজন কি-বোর্ডিস্ট ও সঙ্গীত পরিচালক তিনি। তাঁর অসংখ্য কাজের ভীড়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো নিয়ে আরেকদিন লিখবো। একটি কথা বলেই শেষ করছি। রিজিয়া পারভিন ও পলাশের ‘বলবো তোকে ভালবাসি’ অ্যালবামের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন সোহেল আজিজ। ওই অ্যালবামের একটি গান আমার লেখা। গানের কথাগুলো ছিল এরকম-সারাবেলা সারাদিন অনুভবে সারাক্ষণ/চায় শুধু তোমাকে এ মন।/চুপি চুপি কাছে এসে স্বপ্ন ছড়াও হেসে/থাকো পাশে কিছুক্ষণ।/এই মন শহরে ভাবনা যত/সাজাবো সব তোমারই মত।।
(২৯ জুলাই, দেশবরেণ্য কি-বোর্ডিস্ট ও মিউজিশিয়ান সোহেল আজিজের জন্মদিন উপলক্ষে লেখা)











































