Home Lead খুলনায় ৮০ জলাশয় বিলীন, ১৮ পুকুর উন্নয়নে ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প

খুলনায় ৮০ জলাশয় বিলীন, ১৮ পুকুর উন্নয়নে ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প

2

৮০ জলাশয় বিলীন, ২৭টি আংশিক ভরাট; সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

স্টাফ রিপোর্টার।।

খুলনা নগরীতে একের পর এক জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। কমছে বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক আধার, বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ১৮টি পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। তবে প্রকল্পে পুকুর খনন ও পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাঁটার পথ, ঘাট, ধারণকারী দেয়াল ও শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাশয় রক্ষার প্রকৃত সুফল পেতে হলে সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পানি সংরক্ষণ, মাটির জলধারণ ক্ষমতা এবং পরিবেশগত কার্যকারিতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

কেসিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে নয়টি পুকুরে উন্নয়নকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি বিএল কলেজ পুকুর, হরিজন কলোনি পুকুর, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পুকুর, মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর, তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পুকুর, তালতলা হাসপাতাল পুকুর, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক পুকুর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিস পুকুর এবং মহাশ ট্যাংক পুকুর।

প্রকল্পের আওতায় পুকুর খনন, পানি পরিবর্তন, ঘাট নির্মাণ, হাঁটার পথ, রিটেইনিং ওয়াল, বসার স্থান ও শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুকুরগুলোর বর্তমান গভীরতা কত, সংস্কারের পর কতটা বাড়বে এবং এতে অতিরিক্ত কতটুকু পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে—এসব তথ্য স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি।

২৩ পুকুরের পরিকল্পনা থেকে প্রথম ধাপে ৯টি

কেসিসির ‘খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২)’ প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রথমে ২৩টি পুকুর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) নির্ধারিত ব্যয় ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রথম পর্যায়ে ২৩টির পরিবর্তে নয়টি পুকুরে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডিপিপি সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে বাকি পুকুরগুলোর উন্নয়নকাজ করার কথা রয়েছে।

এর আগে নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল কেসিসি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার জানিয়েছিলেন, পুকুরগুলোর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে।

ব্যবহার উপযোগী পুকুর চান শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা

পুকুর সংস্কার নিয়ে স্থানীয়দের প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি উন্নয়নের ধরন নিয়েও তাঁদের মতামত রয়েছে। তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ বলেন, পুকুরটির বর্তমান অবস্থা ভালো এবং পানি সুন্দর। মাদ্রাসার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুকুরটি বিদ্যমান অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্পাসের পুকুর ও খেলার মাঠ অক্ষুণ্ণ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কেসিসিকে তাদের শর্ত অনুযায়ী কাজ করার জন্য অনাপত্তিপত্রও দেওয়া হয়েছে।

সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হযরত আলী বলেন, পুকুরটি মূলত শিক্ষার্থীদের গোসল এবং মসজিদের মুসল্লিদের অজুর কাজে ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের মাধ্যমে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করা, উন্নত ঘাট নির্মাণ এবং গোসল ও অজুর জন্য পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী ও মুসল্লিরা উপকৃত হবেন।

তবে শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, পুকুরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, পুকুরে বেশি পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর হবে।

মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোডের পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের পানি স্বচ্ছ নয়। পানি পরিষ্কার করে শিশুদের সাঁতার শেখার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। খুলনায় সাঁতার প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা সুইমিং পুল না থাকায় পুকুরগুলোকে নিরাপদ ও ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নও দরকার।

২৯৮ জলাশয়ের মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব বিলীন

নগরীর জলাশয় সংকটের চিত্র উঠে এসেছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২০২৫ সালের জরিপে। জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি জলাশয়ের মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান নগরের অবশিষ্ট জলাশয়গুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব সামনে এনেছে। জলাশয় শুধু বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখে না; নগরের পানি নিষ্কাশন, স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং তাপমাত্রার প্রভাব প্রশমনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, ১৮টি পুকুর সংস্কার করা হলে নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে কিছুটা ভূমিকা রাখা সম্ভব। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নগরের তাপমাত্রার প্রভাব কমাতেও পুকুরগুলো সহায়ক হতে পারে।

তিনি বলেন, খুলনা নগরে প্রতিবছর তাপমাত্রা বাড়ছে কিংবা অতিরিক্ত তাপ অনুভূত হচ্ছে। পুকুরগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।

অতিরিক্ত কংক্রিটে কমতে পারে পরিবেশগত সুফল

পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন অধ্যাপক সালাউদ্দীন। তাঁর মতে, পুকুরের পাড় ও আশপাশের সৌন্দর্য বাড়ানোর নামে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে মাটিতে পানি প্রবেশের সুযোগ কমে যেতে পারে এবং জলাশয় সংরক্ষণের প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তিনি আরও বলেন, যেখানে সম্ভব, সেখানে পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে—এমন ছিদ্রযুক্ত উপকরণ ও উপযোগী নকশা ব্যবহার করা প্রয়োজন। এতে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং জলাশয়ের পরিবেশগত কার্যকারিতা বজায় রাখা সহজ হবে।

তাঁর মতে, নগরের উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও জলাধার—অর্থাৎ ‘ব্লু-স্কেপ’—সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় অপ্রয়োজনীয় কংক্রিটের ব্যবহার এড়িয়ে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

কেসিসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার বলেন, ১৮টি পুকুরের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সৌন্দর্যবর্ধন, খনন, পানি পরিবর্তন এবং প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার ও ঘাটলা নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে কেসিসির আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারি পুকুর পুনঃসংস্কারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরে কেসিসির আরেকটি প্রকল্প অবহিতকরণ সভায় নগরের পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার মধ্যে পরিবেশগত অগ্রাধিকার কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে পুকুর খনন, গভীরতা বৃদ্ধি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা ব্যয় হবে, আর হাঁটার পথ, ঘাট, রিটেইনিং ওয়াল, শৌচাগার ও অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনায় কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে—তার খাতভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের ব্যয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।