আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৭৭ জন। দুর্ঘটনার পর আহত যাত্রীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন সহযাত্রীরা। তাদেরই একজন জোয়াকিম তোরেস। নিজের কোলে এক নারীকে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।
আলজাজিরাকে তোরেস বলেন, আমি ওই নারীকে কোলে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি শ্বাস নেওয়া বন্ধ করেন। তিনি আমার কোলেই মারা যান।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে স্পেনের মধ্যাঞ্চলে উর্দা ও লস ইয়েবেনেস শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাজধানী মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সেভিলের দিকে যাচ্ছিল রেনফে পরিচালিত একটি দ্রুতগতির ট্রেন। সকাল ৯টার কিছু আগে ট্রেনটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের।
দুর্ঘটনার পর ট্রেনের সামনের তিনটি বগি দুমড়েমুচড়ে যায়। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবিতদের খুঁজতে তল্লাশি চালান। অন্যদিকে, সেভিল রেলস্টেশনে স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন নিখোঁজ যাত্রীদের পরিবারের সদস্যরা।
‘ভয়াবহ, কল্পনা করাও কঠিন’
দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রী ও ৪৬ বছর বয়সী চিকিৎসক সেবাস্তিয়ান হেরেরো দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ট্রেনের তিনটি বগি থেকে একের পর এক মানুষকে বের করা হচ্ছিল। তাদের কারও কারও মরদেহ চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘দৃশ্যটি ছিল ভয়াবহ। ওই তিনটি বগিতে কেউ বেঁচে থাকতে পারেন, তা কল্পনা করাও কঠিন। ধাতব কাঠামো দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, যেন সেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
আরেক যাত্রী ফার্নান্দো সেকো জানান, কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করেছিল। এর পরপরই সংঘর্ষ ঘটে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করি। এরপরই দেখি মানুষ শূন্যে ছিটকে যাচ্ছে, আসনও উড়ে যাচ্ছে।’
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন। উর্দা শহরের বাসিন্দা হোসে মারিয়া রাবাদান জানান, তারা ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য খাবার, পানি ও কম্বল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এবং তদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন।
লাল সংকেত উপেক্ষা করে ট্রেন চালানোর নির্দেশ?
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানান, লাইনে একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকায় রেনফের ট্রেনটির সামনে লাল সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও ট্রেনটিকে চলতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, ইতালীয় কনসোর্টিয়াম ইরিও পরিচালিত একটি ট্রেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কম্পিউটার যোগাযোগব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে রেনফের ট্রেনটিকে চলতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা তার ভাষায় ছিল ‘ব্যাখ্যাতীত’।
তবে এ ঘটনায় ট্রেনের চালকদের দায়ী করেননি তিনি। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিরোধী কনজারভেটিভ পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো রেলপথের অবস্থা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আগের দুর্ঘটনার পর নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে, পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মাদ্রিদে বিক্ষোভও হয়েছে।
স্পেনে গত নয় মাসের মধ্যে একই রেলপথে এটি দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় কর্ডোবা প্রদেশের আদামুজে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও অনেকে। ওই দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে রেললাইন ভেঙে যাওয়াকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
পরপর দুটি দুর্ঘটনা দেশটির দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনায় তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, পুরো স্পেন শোকাহত। একই বছরে একটি রাষ্ট্রে দুটি বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্পেনে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্রুতগতির রেলপথে বছরে গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। তবে এ অর্থের মাত্র ১৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে।
অন্যদিকে, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে রেল খাতের বাজেটের গড়ে ৩৩ থেকে ৩৯ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয়েছে।
স্পেনের রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে দেশটিতে দ্রুতগতির ট্রেনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ ব্যবস্থায় প্রায় ৪ কোটি যাত্রী ভ্রমণ করেন, যা ২০১৯ সালের প্রায় দ্বিগুণ। তবে যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কার্তাহেনা পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সালভাদর গার্সিয়া-আইয়োন আলজাজিরাকে বলেন, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় দ্রুতগতির ট্রেন জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্তৃপক্ষ রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করেনি।
দুর্ঘটনাটি স্পেনের ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। আগামী ২৯ নভেম্বর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হওয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সূত্র : আলজাজিরা











































