মিলি রহমান ।।
বাঁশ শুধু পান্ডার প্রিয় খাবার নয়, মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারে বাঁশের কচি অঙ্কুর। কম ক্যালরি ও কম চর্বিযুক্ত এই খাবারে রয়েছে প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিকভাবে রান্না করে খেলে এটি হজমের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বাঁশের কচি অঙ্কুর। চীন ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারে এটি বেশ জনপ্রিয়। পুষ্টিগুণের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাবার নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে প্রকাশিত এক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে বাঁশের কচি অঙ্কুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে।
রক্তে শর্করা ও হৃদ্স্বাস্থ্যে সম্ভাব্য উপকার
গবেষণায় উঠে এসেছে, বাঁশের কচি অঙ্কুরে থাকা খাদ্যআঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি অন্ত্রের কার্যকারিতা এবং রক্তে চর্বি বা লিপিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে, যা হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।
এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় বাঁশের কচি অঙ্কুরের প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্যের কথাও উঠে এসেছে।
গবেষণার সহলেখক ও যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক লি স্মিথের মতে, বাঁশের কচি অঙ্কুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। উচ্চ তাপে কিছু শর্করাযুক্ত খাবার রান্নার সময় তৈরি হওয়া অ্যাক্রিলামাইডের মতো ক্ষতিকর যৌগের প্রভাব মোকাবিলায়ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাঁশের কচি অঙ্কুর সরাসরি কতটা সুরক্ষা দেয়, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, ক্যালরি কম
বাঁশের কচি অঙ্কুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ কম। অন্যদিকে এতে রয়েছে শরীরের প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান।
প্রতি এক কাপ বাঁশের কচি অঙ্কুরে প্রায় ৩ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে। এ ছাড়া এতে খাদ্যআঁশ, প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, ফসফরাস, আয়রন এবং ভিটামিন এ, বি৬, ই ও কে পাওয়া যায়। পাশাপাশি রয়েছে থায়ামিন ও নিয়াসিন।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক জোয়ান সালজে ব্লেকের মতে, বাঁশের কচি অঙ্কুরের খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া এর হালকা স্বাদ ও মচমচে গঠন বিভিন্ন খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য বাড়ায়। ভাজি, স্যুপ, তরকারি, সালাদ, অমলেট কিংবা ভাতের সঙ্গে এটি খাওয়া যায়।
কাঁচা খাওয়া বিপজ্জনক, রান্নায় সতর্কতা জরুরি
বাঁশের কচি অঙ্কুরের পুষ্টিগুণ থাকলেও এটি কাঁচা খাওয়া নিরাপদ নয়। কিছু প্রজাতির কচি বাঁশে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড নামের যৌগ থাকে, যা শরীরে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করতে পারে। ফলে সায়ানাইড বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এসব যৌগের সংস্পর্শ থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুর খাওয়ার আগে সঠিকভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। প্রথমে ভালোভাবে ধুয়ে বাইরের শক্ত ও আঁশযুক্ত অংশ সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপর ছোট টুকরো করে কেটে পর্যাপ্ত পানিতে অন্তত ৩০ মিনিট সেদ্ধ করতে হবে অথবা প্রজাতি ও প্রস্তুতপ্রণালির উপযোগী নির্দেশনা অনুসারে সম্পূর্ণ সিদ্ধ করতে হবে। শুধু ধুয়ে বা অল্প সময় রান্না করে খাওয়া উচিত নয়।
সঠিকভাবে সেদ্ধ করার মাধ্যমে ক্ষতিকর সায়ানোজেনিক যৌগের ঝুঁকি কমানো যায়। তবে নিরাপদ প্রস্তুতপ্রণালি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুরও বিকল্প
সব জায়গায় তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুর পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুর ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো সাধারণত আগে থেকেই প্রক্রিয়াজাত করা থাকে এবং বিভিন্ন রান্নায় সহজে ব্যবহার করা যায়।
নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ও শেফ অ্যাবি গেলম্যানের মতে, তাজা ও ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুর বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমতে পারে। ক্যানজাত পণ্যে অতিরিক্ত লবণ রয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়া এবং প্রয়োজনে ব্যবহারের আগে পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া ভালো।
সব মিলিয়ে, বাঁশের কচি অঙ্কুর সুষম খাদ্যতালিকার একটি পুষ্টিকর উপাদান হতে পারে। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই সুস্থ থাকা বা রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত হয় না। বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুতিই সুস্থ জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ও সংশ্লিষ্ট গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন।











































