Home সম্পাদকীয় প্রয়াত মনজুরে মওলা

প্রয়াত মনজুরে মওলা

15

করোনা সঙ্কটে সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশও বিপন্ন অবস্থায় নিপতিত। সংক্রমণ আর মৃত্যুর হার আমাদের এক বিপর্যস্ত অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করেছে। বহুল সংক্রমণ এই রোগটি বয়স্ক লোকের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে বেশি। সঙ্গত কারণেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক জ্ঞানী-গুণীর চলে যাওয়া এক দুঃসহ বেদনার। দেশের অনেক সম্মানিত আর বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বকে আমরা হারিয়েছি এই করোনা দুর্যোগে। নতুন করে আরও একজনের নাম যুক্ত হলো মৃত্যুর তালিকায়। তিনি কবি, গবেষক ও আমলা মনজুরে মওলা। এই পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। অমর একুশে গ্রন্থমেলার বিশিষ্ট আয়োজক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। তাঁর হাত দিয়েই অমর একুশে গ্রন্থমেলা নতুন যাত্রা শুরু করে। আর রবীন্দ্র গবেষক হিসেবে তাঁর অনন্য উচ্চতাও স্মরণীয়। ১৯৪০ সালের ১ অক্টোবর জন্ম নেয়া এই বিখ্যাত মানুষটি ৮০ বছর পার করতে না করতেই মরণ ঘাতক করোনায় আক্রান্ত হলেন। পিতা খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ কাজী আম্বর আলী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ বহু শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করার এক আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষক। তাঁরই যোগ্য উত্তরাধিকার মনজুরে মওলা শৈশব-কৈশোর অতিক্রান্ত করেন এক বর্ণময় জ্ঞানচর্চার বিশুদ্ধ পরিবেশে। নিজেকে যুগের উপযোগী তৈরি করতে তাকে কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অবশ্য অভাবনীয় ক্ষমতা এবং মনন ও সৃজন দ্যোতনার অবিস্মরণীয় যোগসাজশে তিনি হয়ে ওঠেন সমকালের এক অনন্য কৃতী পুরুষ। ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে পাঠ গ্রহণ। পরবর্তীতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণায় অংশ নেয়া এই বিশিষ্ট প্রাজ্ঞজন সরকারী চাকরিতেও তাঁর অনন্য সফলতায় নিজেকে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করেছেন। সমৃদ্ধ পেশাগত জীবনে সচিবের দায়িত্ব পালন করা এই কৃতী আমলা পরবর্তীতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকই শুধু নন, রবীন্দ্র গষেণায় নিজেকে নিঃশর্ত সমর্পণ করারও এক বিজ্ঞ প-িত।

জীবনের সুবর্ণ সময়ের মধ্যে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল-এই পাঁচ বছরের সফল কর্মজীবন তাঁকে যে উচ্চতায় নিয়ে যায়, সেখানে বাংলা ভাষা আর সংগ্রামী ঐতিহ্যও পায় এক অভাবনীয় নতুন কর্মযোগ। তারই কর্মদিবসের সফল অভিযোজনে ‘একুশ আমাদের পরিচয়’ স্লোগানে বাংলাদেশ পায় এক আকাক্সিক্ষত জগত। অমর একুশে গ্রন্থমেলার সাড়ম্বর অভিগমন। বাংলাদেশের ভাষার মাস ও ঐতিহ্যিক ইতিহাসের এক নবতর সূচনা তো বটেই। এ ছাড়াও যুক্ত হয় অমর একুশে জীবনীমালা, যা বাঙালীর জীবন ও আলোকিত অধ্যায়ের এক বিরল সৃজন ধারা। এই গুণী ব্যক্তিত্বের রয়েছে আরও কিছু কীর্তিময় কাজ। ঐতিহাসিক বর্ধমান ভবন সংস্কার, প্রথম জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি প্রদর্শনীর আয়োজন। ভাষা শহীদ গ্রন্থমেলার ১০১টি ব্যতিক্রমী বই প্রকাশ বাংলা একাডেমির ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। খ্যাতিমান ইংরেজী কবি টিএস ইলিয়টের ওপর গবেষণা কর্ম সমাপ্ত করে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন সফল জীবনের আরও এক সুবর্ণ অধ্যায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর জ্ঞানগর্ভ গবেষণায় বাংলা সাহিত্য পায় এক অন্য রবীন্দ্রনাথকে। আর রবীন্দ্রভক্ত মনজুরে মওলা নিজেও হন পরিতৃপ্ত, পূর্ণ এবং অনবদ্য এক জ্ঞান সাধকের মর্যাদায়। এমন গুণী ব্যক্তিত্বকে আমরা হারালাম করোনাকালের চরম দুঃসময়ে। বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগের মধ্যে করোনা সংক্রমণ তাঁকে আর বেশি দিন পৃথিবীতে বাঁচতে দেয়নি। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।