Home জাতীয় সালতামামি-২০২০ : খালেদা জিয়ার মুক্তিতে ছিলো বিএনপির কিছুটা স্বস্তি

সালতামামি-২০২০ : খালেদা জিয়ার মুক্তিতে ছিলো বিএনপির কিছুটা স্বস্তি

56

বিশেষ প্রতিনিধি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘মুক্তি’ই ছিল ২০২০-এ বিএনপির নেতা-কর্মীদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। দীঘদিন কারাগারে থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে কারামুক্ত হয়ে এখন বাসায় অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। এতে চলতি বছর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে। আর বছরের শেষ সময়ে এসে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে শোকজ করার মাধ্যমে বছরটি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে পার করছে দলটি। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বাসায় দলীয় নেতা-কর্মীদের ডিম ছুড়ে মারার ঘটনায় হতবাক হয়েছে দলটির সবস্তরের নেতা-কর্মীরা। দুই বছর বন্দি থাকার পর চলতি বছর কারাগার থেকে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। দলের চেয়ারপারসন জেলের বাইরে- এ বিষয়টি বিএনপির জন্য খুব একটা যে স্বস্তিকর, তা নয়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায় দ- স্থগিত করে মুক্তি নেয়ার কারণে নিয়মিতই কটুকাটব্য শুনতে হচ্ছে বিএনপিকে। কিন্তু কোনো জবাব দিতে পারছে না তারা। ২০২০ সালটা তাই বিএনপির জন্য একদিক দিয়ে স্বস্তির, আবার অন্যদিক দিয়ে অস্বস্তিতে কেটেছে। স্বস্তির কারণ, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আর অস্বস্তি হচ্ছে মুক্তির প্রক্রিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের দ- নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপি রাজপথের আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ে তাকে মুক্ত করে আনার কথা বলেছিল। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে গিয়ে উল্টো পাঁচ বছরের সাজা ১০ বছর হয়েছে। আবার জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাজা হয়েছে সাত বছর। আইনি লড়াইয়ে ব্যর্থতার পর উদ্যোগী হয় খালেদা জিয়ার পরিবার। তার ভাই-বোনের আবেদনে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায় নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করিয়ে গত ২৫ মার্চ মুক্তি দেয়া হয় ছয় মাসের জন্য। এরপর মুক্তির মেয়াদ বাড়ে আরো ছয় মাস।

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর খালেদা জিয়া অনেকটাই নিভৃতে রয়েছেন। কোনো বক্তব্য, বিবৃতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসেনি তার পক্ষ থেকে। এমনকি স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মতো দিনগুলোতেও তিনি নীরব। জনগণকে শুভেচ্ছা জানাননি তিনি। বিএনপি এই মুক্তি নিয়ে এতটাই অস্বস্তিতে যে, নেত্রীর মুক্তিতে দলের ভূমিকা অস্বীকার করা হচ্ছে। বিএনপি বারবার বলছে, পারিবারিক আবেদনের সঙ্গে দলের সম্পৃক্ততা নেই। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার কী আর্জি নিয়ে গিয়েছিলেন, এ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে পরিবারও কথা বলতে রাজি নয়। বিএনপি নেতাদের মতো তারাও গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেন। এ বিষয়ে শামীম এস্কান্দারকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মিডিয়ার সঙ্গে কোনো কথা বলব না।’ একই প্রসঙ্গে তার ছোট বোন সেলিনা ইসলাম প্রসঙ্গ এড়িয়ে অন্য বিষয়ে কথা বলতে থাকেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘বেগম জিয়া কখনো আপসের পক্ষে ছিলেন না। আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা ছিল।’ তাহলে পরিবার থেকে কেন এমন আবেদনÑজানতে চাইলে বিএনপি নেত্রীর পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই চালানো এই নেতা বলেন, ‘পরিবার মানবিক কারণ দেখিয়ে আবেদন করে। সরকার তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে নির্বাহী আদেশে তাকে (খালেদা জিয়া) মুক্তি দেয়। এটা সরকার আর পরিবার ভালো জানবে।’ অপরদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে প্রায়ই সরকারি দল ও জাতীয় পার্টির নানা কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে বিএনপিকে। সাময়িক মুক্তির পর খালেদা জিয়া অবস্থান করছেন গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায়। কেমন আছেন ৭৫ বছর বয়সী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী? খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে চোখ ও দাঁতের সমস্যা, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছেন। মুক্তি পেলেও করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এখনো তার উন্নত চিকিৎসা শুরু হয়নি। ছোট বোন সেলিনা ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা মোটেও ভালো না। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিবারের সদস্যদের বাইরে দুজন চিকিৎসক আপাতত চেয়ারপারসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন না। অন্য কেউ এখন অ্যালাউড না। বেগম জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগম আর একজন নার্স। লন্ডনে বসে প্রতিনিয়ত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবায়দা রহমান। দুই নেতাকে শোকজ: দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে সরকার পরিবর্তন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে শোকজ করার মাধ্যমে বছরটি পার করছে বিএনপি। বিএনপি, জামায়াত, ঐক্যফ্রন্ট ও বামসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও কিছু পেশাজীবী নেতা সরকার পতনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলে বেশ কিছুদিন ধরে প্রচার করা হয়। এ জন্য ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে বেছে নেয়া হয়। এ কর্মসূচিতে অংশ না নিতে শেষ মুহূর্তে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের কঠোর বার্তা দেয়া হয়। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদ ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। এ কারণে তাদের শোকজ করা হয়। হাফিজ উদ্দিনকে ৫ দিন ও শওকত মাহমুদকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়।

এদিকে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে শোকজের জবাব দিয়েছেন শওকত মাহমুদ। তিনি বলেছেন, জাতীয়তাবাদী দলের আদর্শের বাইরে, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো কাজে তিনি জ্ঞাতসারে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এর পরও তার অজান্তে কোনো কাজে জড়িত হয়ে পড়লে সে জন্য তিনি দুঃখিত। আর হাফিজের উত্তর ছিল ‘তোষামোদি আর নয়’।

ফখরুলের বাসায় ডিম ছোড়া: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্তরার বাসভবনে ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ করার অপরাধে স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ১৭ নেতাকর্মীদের গত ১২ অক্টোবর বহিষ্কার করা হয়। ৯ অক্টোবর বিকেলে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা-১৮ আসনে যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার ঘোষণা দেন। মূলত এর পর থেকেই ঢাকা-১৮ আসনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ওই আসনে দল থেকে আরো ৮ প্রার্থী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়ার আগে ১২ সেপ্টেম্বর গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ওইদিন এসএম জাহাঙ্গীর ও কফিল উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর সাত প্রার্থী দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবরে অভিযোগ দিয়ে এ ঘটনার জন্য জাহাঙ্গীরকে দায়ী করে তাকে মনোনয়ন না দেয়ার আবেদন করেন। কিন্তু হঠাৎ করে জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দেওয়ার পর নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে মহাসচিবের বাসায় ডিম ছোড়ার মধ্যে দিয়ে।

ঢাকা উত্তরে বিরোধ: ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবদুল আলীম নকিকে নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে মহানগর নেতাদের মধ্যে। ফলে সমন্বয় হচ্ছে না দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে। দূরত্ব সৃষ্টির কারণে সমন্বয় নেই বললেও চলে। তবে প্রকাশ্যে বেশ কয়েকজন নেতা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সাংগঠনিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

এদিকে সম্প্রতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান। তার পদে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি আবদুল আলীম নকিকে ভারপ্রাপ্ত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম যুগ্ম সম্পাদককে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করার কথা। কিন্তু তা না করে সহসভাপতিকে বেছে নেয়ায় এই বিরোধ।

করোনার মধ্যেও কিছু কমিটি: পবিত্র ঈদুল আজহার আগে স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনের পর পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ ও ঝাড়– মিছিল করেছেন। এসব পরিস্থিতির পর কমিটি গঠন কার্যক্রম পিছু হটেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। একই সঙ্গে অংগ-সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারাও পিছু হটেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও কমিটি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এ কমিটি গঠন নিয়ে অনেকের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের।

বন্যাদুর্গত মানুষদের পাশে: ঈদুল আজহার দিন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সাক্ষাতে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন বন্যা ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে। তার নির্দেশের পর দলের অনেক শীর্ষ নেতা বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। ৫০২ বিশিষ্ট বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির স্থায়ী কমিটির বর্তমান সদস্য রয়েছেন ১১ জন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ৬৮ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৩৫ জন ও যুগ্ম মহাসচিব হয়েছেন ৭ জন। এদের মধ্যে গুটিকয়েক নেতাকে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। বাকিরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

জ্যেষ্ঠ নেতারা ‘আইসোলেশনে’: বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা ভাইরাসের মধ্যেও থেমে ছিল না বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের কর্মযজ্ঞ। গত ২৬ মার্চ এর পর থেকে করোনাকালে গৃহবন্দী অবস্থায় কেউ লিখছেন বই, কেউ বা চালাচ্ছেন দলীয় ভার্চুয়াল মিটিং, সভা-সেমিনার, কেউ বা করছেন পড়ালেখা। আবার অনেকে সময়কে কাজে লাগাচ্ছেন ইবাদত-বন্দেগিতে।

নারীদের দলীয় রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধকরণ: দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ অথবা তার বেশি নারী নেত্রীকে দলের বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। এ সিদ্ধান্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন দলটির শীর্ষ নেতারা। গত ১২ জুলাই জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ফের নির্বাচনমুখী বিএনপি: করোনা ভাইরাসের কারণে বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপ-নির্বাচন বর্জন করলেও পাঁচটি আসনের উপ-নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। করোনা মহামারীর মধ্যেই ঢাকার দুজনসহ আওয়ামী লীগের পাঁচজন সাংসদ মারা যান। তাদের শূন্য আসন পাবনা-৪, ঢাকা-৫, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১৮ ও নওগাঁ-৬ আসনে নির্বাচন হয়। সব আসনে অংশ নেন বিএনপির প্রার্থীরা। এছাড়া উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন নির্বাচনেও অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে দলটির।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘নির্বাচনে যাব না, এ কথা আমরা কখনো বলিনি। তখন কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েও সরে এসেছি। এখন যেহেতু সবকিছু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাই আমরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’-মানবকন্ঠ