স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট, মোংলা, ফকিরহাট ও রূপসা প্রতিনিধি।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ও শিল্পনগরী খুলনায় ঐতিহাসিক সফরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সারাদিনব্যাপী নানা কর্মসূচি, মোংলা বন্দরে মেগা বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর, ডাকবাংলা মোড়ে আকস্মিক পথসভা এবং খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে খুলনার মাটি ও মানুষের সঙ্গে এক অনন্য বন্ধন তৈরি করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক বর্ণিল ও উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছালে হাজারো শিশু-কিশোর, ক্রীড়াপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
সুসজ্জিত মাঠ প্রদক্ষিণ করে গ্যালারিতে উপস্থিত উদীয়মান ক্রীড়াবিদ ও শিক্ষার্থী-দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা যেমন মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করবে, ঠিক তেমনি খেলাধুলায়ও সমানভাবে পারদর্শী হবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি কারাতে, আর্টস এবং বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা শেখা জরুরি। তোমরা যাতে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার সব শাখায় দক্ষতা অর্জন করতে পারো এবং একটি বিদেশি ভাষার পাশাপাশি তৃতীয় কোনো ভাষা শিখতে পারো, সে জন্য সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই প্রিয় বাংলাদেশকে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমে তোমাদিকেই গড়ে তুলতে হবে। বৈশ্বিক অঙ্গনে ও বিশ্বদরবারে আমাদের দেশের সুনামকে উজ্জ্বল করতে তরুণ প্রজন্মকেই সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।” অনুষ্ঠানে অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বাছাইকৃত ৪০ জন কৃতি ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর হাতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে ভর্তির অফার লেটার তুলে দেন।
পূর্বনির্ধারিত সূচিতে না থাকলেও খুলনার ডাকবাংলা মোড়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের ব্যাকুল অপেক্ষার কথা মাথায় রেখে সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ এক গণপথসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ৩টা ২১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাসটি ডাকবাংলা মোড় অতিক্রম করার সময় খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি বাস থেকে নেমে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন।
মঞ্চে দেওয়া ভাষণে খুলনা অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর মাধ্যমে স্থানীয় যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে শিল্প-বাণিজ্যে পুনরায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে শিল্পাঞ্চল হিসেবে খুলনার ঐতিহাসিক পরিচিতি ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি খুলনাবাসীর মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তোলা এবং নগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
এর আগে সকালে মোংলা বন্দরে ‘মোংলা বন্দর সুবিধার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেক জায়ান্ট চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) সঙ্গে মেগা অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও সেবা খাতের মোট ১৪টি বিষযে একটি বহুমুখী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ-চীন মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ, বিশেষায়িত ফ্রেইট করিডর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার ভিশনের অংশ হিসেবে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
পরবর্তীতে বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাটাখালী এলাকায় সংক্ষিপ্ত পথসভায় বক্তৃতা করেন। সেখান থেকে সরাসরি হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারে পৌঁছে জিয়ারত ও মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই মাজার মোড়সহ ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী লাল-সবুজ রঙের বাসটি মাজার প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন উপস্থিত জনতা।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে রূপসার কুদির বটতলা থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামমুখী পুরো পথজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তোরণ ও ব্যানারনির্ভর প্রথা ভেঙে শহরকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব রাখার এই রাজনৈতিক উদ্যোগ বেশ প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে, এসএসএফ, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি, সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুক, আজিজুল বারী হেলাল, আলী আজগার লবী, আমির এজাজ খান, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাহফুজ আলম খানসহ স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।











































