Home জাতীয় এলএনজিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি

এলএনজিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি

3

ঢাকা অফিস।।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২০ ডলার হলে বাংলাদেশকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। চলতি বছর সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এর চেয়েও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে নতুন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালে বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়ছে। এত ব্যয়ের পরও দেশে গ্যাস সংকট কাটছে না।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও অর্থনীতি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) নতুন এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন ইমার্জিং এশিয়া: আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। তবে এলএনজি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ ব্যয়ে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বহিস্থ অর্থায়নের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। এর পরও অনির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহের কারণে দেশে গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে।

আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, গত চার-পাঁচ বছরে এলএনজির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য জ্বালানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছাড়াও ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের এলএনজিভিত্তিক প্রকল্প পর্যালোচনা করা হয়েছে। চার দেশে ১০ হাজার ৯২০ কোটি ডলার সম্ভাব্য বিনিয়োগের ৯২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের ৪৪টি আমদানি টার্মিনাল পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ২২টি টার্মিনাল বাতিল হয়েছে অথবা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার।

চার দেশে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানি টার্মিনালের ১৫ শতাংশ গত পাঁচ বছরে চালু হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে। অথচ প্রকল্প উন্নয়নকারীরা সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন।

আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজির দামে অস্থিরতা, প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস টারবাইনের সংকট এবং ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব কারণে ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হচ্ছে।

প্রতিবেদনের সহলেখক ও আইইইএফএর এশিয়ার এলএনজি ও গ্যাস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডোলম্যান বলেন, এসব ঝুঁকির কারণে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জীবনকালজুড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ২০২১ সালের প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছায়, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের প্রায় তিন গুণ। অন্যদিকে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমছে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়েও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শফিকুল আলম বলেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন হিট পাম্প ব্যবহারের মতো উদ্যোগও নিতে হবে।

প্রতিবেদনে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থায়ন ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তায় ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের অনেক প্রকল্প আটকে আছে। থাইল্যান্ডে প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলেও বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালের বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে।