Home খেলাধুলা আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদো-মেসির দুই রকম বিদায়

আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদো-মেসির দুই রকম বিদায়

1

স্পোর্টস ডেস্ক।।

পর্তুগাল ও আর্জেন্টিনার হয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল ঘটনাবহুল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় দুজনই দেখেছেন আনন্দ, হতাশা, শিরোপার উল্লাস আর হৃদয়ভাঙা মুহূর্ত।

বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন দীর্ঘদিন ভাগাভাগি করে নেওয়া এই দুই মহাতারকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিদায়টাও হলো সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।
গত ৫ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো।

পর্তুগালের সমর্থক ও তার ভক্তদের জন্য সিদ্ধান্তটি ছিল বড় ধাক্কা। দেশের হয়ে দীর্ঘ পথচলার ইতি টানার ঘোষণা তিনি দিলেন মাঠের বাইরে, অনেকটা নীরবেই। অন্যদিকে মেসির বিদায় ছিল আবেগ আর উদ্‌যাপনে ভরা। গত ৬ অক্টোবর পরিবারের সদস্য ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উপস্থিতিতে হাজারো মানুষের সামনে বিদায় জানান তিনি।

বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে আর্জেন্টিনাকে ফেরানোর নায়ককে শেষবারের মতো সম্মান জানাতে সেদিন সমবেত হয়েছিলেন সমর্থকরা। দুই বিদায়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র এক মাসের, অথচ আয়োজন ও আবহে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
বড় স্বপ্ন নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করেছিলেন রোনালদো। তবে একদিন পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা আইকনে পরিণত হবেন, এমনটা হয়তো নিজেও ভাবেননি।

শুরুতে অনেক হতাশা ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবে সেসব পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের শিখরে পৌঁছান তিনি। তার নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও জেতে দলটি।

শুধু শিরোপা জিতেই নয়, ব্যক্তিগত অর্জনেও ইতিহাস গড়েছেন রোনালদো। ১৪৬ গোল নিয়ে পর্তুগাল ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। জাতীয় দলের হয়ে তার এই রেকর্ড সহজে ছোঁয়ার নয়।

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও রোনালদোর সামনে এখনো একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। পেশাদার ক্যারিয়ারে ১ হাজার গোলের মাইলফলক থেকে মাত্র ১৫ গোল দূরে তিনি। বুটজোড়া তুলে রাখার আগে এই কীর্তি গড়তে চান পর্তুগিজ মহাতারকা।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথচলাটা ছিল আরও বেশি বন্ধুর। বড় বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে না পারায় দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের হতাশা সইতে হয়েছে এই ফরোয়ার্ডকে।

তবে ব্যর্থতার কাছে হার মানেননি মেসি। একের পর এক হতাশা পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন দুটি কোপা আমেরিকা ও ২০২২ বিশ্বকাপের শিরোপা। পাশাপাশি জেতেন ফিনালিসিমাও। একসময় যে সমালোচনা তাকে ঘিরে ছিল, সাফল্যের মধ্য দিয়ে সেটিকেই প্রশংসায় রূপ দেন তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় দলকে বিশ্বজয়ের স্বাদ পেতে দেখেন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা।

জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির পরিসংখ্যানও অবিশ্বাস্য। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচ খেলে দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ১২৬ গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতাও মেসি। তালিকায় তার পরেই থাকা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার গোল ৫৪টি।

শুধু গোল করেই দায়িত্ব শেষ করেননি মেসি। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৬৬ গোল। সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার গোল ও গোলে সহায়তার সংখ্যা ১৯২। জাতীয় দলের হয়ে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত, সেই পরিসংখ্যানই তা স্পষ্ট করে।

দুই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অর্জনে যেমন মিল রয়েছে, বিদায়ের দৃশ্যপটে তেমনই ছিল বড় পার্থক্য। মেসির বিদায় ঘিরে ছিল আবেগঘন আয়োজন। পরিবারের সদস্য ও দেশের সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে পাওয়া সেই সম্মান ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার অবদানের স্বীকৃতি। বিপরীতে, নিজের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে ভিডিও প্রকাশ করে রোনালদোর অবসরের ঘোষণা ছিল অনেকটাই নিভৃতে এবং অপ্রত্যাশিত।

পার্থক্য শুধু বিদায়ের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দুই তারকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের পরিস্থিতিও ছিল আলাদা। কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে বিরোধ ও টানাপোড়েনের মধ্যেই রোনালদো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্কের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি অবসরের ঘোষণার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

মেসির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের অধিকাংশ স্বপ্ন পূরণ করার পর তার বিদায় ঘিরে ছিল প্রশংসা ও উদ্‌যাপন। কোনো সংকট বা বিরোধের আবহ নয়, বরং জাতীয় দলের জার্সিতে তার অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েই বিদায় জানাতে চেয়েছেন সমর্থকরা।

একজনের বিদায়ে ছিল বিস্ময় ও বিরোধের ছায়া, অন্যজনের বিদায়ে আবেগ ও কৃতজ্ঞতা। এভাবেই ভিন্ন পথে শেষ হলো বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকার আন্তর্জাতিক অধ্যায়। শুরুটা দুজনেরই ছিল মহাকাব্যিক, শেষটাও রয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই গল্প হয়ে।