Home আলোচিত সংবাদ দড়ি টেনে চলে প্রতিবন্ধী জনির সংসার

দড়ি টেনে চলে প্রতিবন্ধী জনির সংসার

11

বাগেরহাট প্রতিনিধি।।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে, আছে নানা প্রতিকূলতা। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই প্রতিবন্ধী জনি মোল্লার। ভোরের আলো ফোটার আগেই চলে আসেন ভৈরব নদীর খেয়াঘাটে। নৌকার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি টেনে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাত্রী পারাপারের কাজ করেন।

কখনো রোদে পুড়ে, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে, আবার কখনো নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে কাটে তার দিন। সকাল ৫টায় শুরু হওয়া এই পরিশ্রম শেষ হয় রাত ১১টায়। দিন শেষে মজুরি পান ৪০০ টাকা। সেই টাকায় নিজের প্রয়োজন মেটানোর কথা ভাবেন না জনি, তুলে দেন বাবার হাতে। কারণ, এই টাকাতেই চলে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার।


৩৫ বছর বয়সী জনি মোল্লার শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অন্য কাজ করার সামর্থ্যও সীমিত। কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব তাকে বসে থাকতে দেয়নি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন ছুটে আসেন ঘাটে।

জনি বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মনি মোল্লা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রায় আট বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর বাজারসংলগ্ন কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটে দড়ি টেনে নৌকা পারাপারের কাজ করছেন জনি। ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক।

ভৈরব নদীর এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। নৌকার সঙ্গে বাঁধা দড়ি টেনে তাদের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করেন জনি। কখনো নদীর স্রোত তীব্র হয়, কখনো প্রখর রোদে কাজ করতে হয়, আবার কখনো বৃষ্টিতে ভিজে নৌকা টানতে হয় তাকে। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই চলে তার প্রতিদিনের কাজ।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করলেও জনির উপার্জন সীমিত। প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পান তিনি। সেই টাকা নিজের কাছে না রেখে পুরোটা বাবার হাতে তুলে দেন। বাবাই সেই টাকা দিয়ে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার চালান। দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে কখনো শরীর খারাপ হলেও সংসারের কথা ভেবে কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাকে।

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে জনি মোল্লা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমি নৌকা চালাই। এই ঘাটে প্রায় সাত-আট বছর ধরে কাজ করছি। আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা আছে। তারপরও আমি কাজ করি আমার সংসার চালানোর জন্য। আমি কাজ না করলে আমার পরিবারের ৬ জন না খেয়ে থাকবে। প্রতিদিন ৪০০ টাকা পাই। এই টাকা পুরোটা আব্বুর হাতে দিয়ে দিই। আব্বু এই টাকা দিয়ে সংসার চালান। আমি সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকি। মাঝে মধ্যে শরীর খারাপ থাকলে একটু সমস্যা হয়।”

জনিকে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটে কাজ করতে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তার শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কথা জানেন তারা। তাদের মতে, প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবারের জন্য জনির এই পরিশ্রম সহজ নয়। তার জন্য আর্থিক সহায়তা কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে জীবনযাপনের কষ্ট কিছুটা কমতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা খানম বলেন, “জনির বয়স আনুমানিক ৩২-৩৩ বছরের মতো হবে। কিন্তু ওরে দেখলে বোঝা যায় না। ওর শারীরিক সমস্যা আছে, মানসিক সমস্যাও আছে সামান্য। এই খেয়া টানা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারে না শুনেছি। গরিব ও প্রতিবন্ধী এই ছেলে, ওকে যদি একটু আর্থিক সহযোগিতা করতো মানুষ, তাহলে ভালো করে চলতে পারতো।”

যাত্রাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা হাসান শেখ কয়েক বছর ধরে এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। তার চোখেও পড়েছে জনির প্রতিদিনের পরিশ্রম।

হাসান শেখ বলেন, “আমি এখান থেকে প্রায় ৩-৪ বছর ধরে চলাচল করি। দীর্ঘদিন ধরে জনিকে এই নৌকা চালাতে দেখছি। ওর একটু মানসিক সমস্যাও রয়েছে। দেখে মনে হয় কাজ করতে বেশ কষ্ট হয়। তারপরও ছেলেটি হাল ছাড়ে না। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে দিনরাত পরিশ্রম করে।”

ঘাটের ইজারাদার মো. মাসুম মোল্লা জানান, জনিকে কাজের বিনিময়ে নগদ ৪০০ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি তিন বেলা খাবার ও চা-নাশতা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকার সুবিধা পান তিনি। ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থেকে নৌকা পারাপারের কাজ করেন জনি।

মাসুম মোল্লা বলেন, “জনির নিজের কোনো জায়গা-জমি নেই। তার বাবা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি যে ৪০০ টাকা পান, তা বাবাকে দিয়ে দেন। যদি তাকে কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, দোকান বা অন্য কিছু যদি সরকারের পক্ষ থেকে করে দেয়, কিংবা সমাজের বিত্তবানরা একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে সে বাকি জীবনটা ভালোভাবে কাটাতে পারবে।”