Home Lead নদী গিলে খাচ্ছে ঘরবাড়ি, অস্তিত্ব সংকটে উপকূলের মানুষ

নদী গিলে খাচ্ছে ঘরবাড়ি, অস্তিত্ব সংকটে উপকূলের মানুষ

7


দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে নদীভাঙন দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিনটি পৃথক দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এ উপজেলায় শিবসা, ঢাকী, চুনকুড়ি, পশুর, ঝপঝপিয়া ও মাঙ্গার মতো রাক্ষসী নদীর ভাঙন এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। একদিকে জলবায়ুর প্রভাব অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ভাঙনের কবলে পড়ে সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, এমনকি সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা ৩১,৩২ ও ৩৩ এই তিন পোল্ডারে বিভক্ত। এর মধ্যে ৩১ নম্বর পোল্ডার ও দ্বীপের আওতায় রয়েছে চালনা পৌরসভা, পানখালী ও তিলডাঙ্গা ইউনিয়ন। ৩২ নম্বর পোল্ডারে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বাজুয়া, দাকোপ, কৈলাশগঞ্জ,লাউডোভ ও বানিয়াশান্তি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক থেকে নেওয়া ১৫০ কোটি টাকা ঋণে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে নতুন ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও এ দুই পোল্ডারের নতুন কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ষাটের দশকে নির্মিত ৩১ নম্বর পোল্ডারের চালনা পৌরসভা, পানখালি ও তিলডাঙা ইউনিয়নের। এসব এলাকার অনেক অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙে রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সাময়িকভাবে বালুভর্তি জিও টিউব ফেলে পানি আটকানো হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো এখনো অরক্ষিত রয়েছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর সকালে তিলডাঙা ইউনিয়নের বটবুনিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢাকী নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ৭টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। তবে দ্রুত জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ দেওয়ায় সে যাত্রায় হাজারো পরিবার ও প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমির ফসল রক্ষা পায়। এর আগেও বটবুনিয়া এলাকায় বেশ কয়েকবার বেড়িবাঁধ ভেঙে বহু মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে।

একই অবস্থা বিরাজ করছে পানখালি ইউনিয়নের খোনা মোল্লা বাড়ি ও খলিশা এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে। সম্প্রতি এসব এলাকার বেড়িবাঁধের মূল অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেলে খোনা এলাকায় বালুভর্তি জিও টিউব দিয়ে রিংবাঁধ এবং খলিশা এলাকায় মাটি দিয়ে বাঁধ পুনরায় নির্মাণ করা হয়। তবে ভাঙনের কারণে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের বসতভিটা। বাঁধ ভেঙে গেলে অনেক সময় কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ব্যক্তিসমালিকানা জমির ওপর দিয়ে নতুন করে বাঁধ দিতে বাধ্য হন ক্ষতিগ্রস্তরা।

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো তিলডাঙার বটবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা রিনা সরদার বললেন, আমার আর কিছু নেই, নদী সব গিলে ফেলেছে। কয়েক দফা ভাঙতে ভাঙতে জায়গা-জমি সব গেছে নদীতে। এখন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে অন্যের জায়গায় থাকছি।

পানখালির খোনা এলাকার বাসিন্দা লিটন মোল্লা জানালেন, আমাদের আগে যেখানে বাড়ি ছিলো এখন সেখানে মাঝ নদী। আমাদের মতো অনেক পরিবার ছিলো কিন্তু সব হারিয়ে গেছে নদীর মাঝে। কেউ ভিতরে এসে বাড়ি করেছে আবার কেউ অন্য এলাকায় চলে গেছে।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিটু জানালেন, বটবুনিয়া এলাকায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৭টি পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শুকনা খাবার এবং ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তবে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আপাতত পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ইউএনও আরও জানালেন, নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে জিও টিউব ও বাঁধ সংস্কারের কাজ করা হচ্ছে। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, বরাদ্দ পেলে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।