মিলি রহমান।।
গরম মসলা হলো বিভিন্ন মসলার সমন্বয়ে তৈরি একটি সুগন্ধি মিশ্রণ, যা সাধারণ খাবারকেও সুস্বাদু করে তুলতে পারে।তবে গরম মসলার বিশেষত্ব শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গরম মসলা কী কী উপাদানে তৈরি?
বিশেষ করে শরীরের ‘হজমশক্তি’ বা ‘ডাইজেস্টিভ ফায়ার’ বাড়াতে গরম মসলা কার্যকর বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। এর ফলে খাবার হজম করা সহজ হয় বলে মনে করা হয়।
অঞ্চলভেদে গরম মসলার উপাদানে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। তবে সাধারণত এতে থাকে-
গোলমরিচ
এলাচ
দারুচিনি
লবঙ্গ
ধনে
জিরা
জায়ফল
গরম মসলার ৯টি স্বাস্থ্য উপকারিতা
১. হজমশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে
গরম মসলা শরীরের ‘হজমশক্তি’ বাড়ায়—প্রচলিত এই ধারণার পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।গরম মসলার অন্যতম প্রধান উপাদান জিরা হজমে সহায়তাকারী এনজাইমের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, জিরার নির্যাস ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) বা অন্ত্রের এক ধরনের সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
গোলমরিচও হজমতন্ত্রের জন্য উপকারী বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।এ ছাড়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গরম মলা দিয়ে তৈরি খাবার খেলে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের খাবার হজমের সময় কমতে পারে।
২. শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে
গরম মসলার প্রতিটি উপাদানেই রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। একাধিক মসলা একসঙ্গে মেশানোর ফলে এতে বিভিন্ন ধরনের উপকারী যৌগের সমন্বয় ঘটে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দারুচিনি।
২০০৫ সালে চীনে পরিচালিত একটি গবেষণায় ২৬ ধরনের মসলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দারুচিনিকে সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ মসলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এ ছাড়া এলাচ ও লবঙ্গেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান।
৩. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতায় সহায়তা করে
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদ্যন্ত্রের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে এলাচের সম্ভাব্য উপকারিতা রয়েছে।
অন্যদিকে, ধনে রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গরম মসলায় ক্যালরির পরিমাণও তুলনামূলক কম। তাই প্রতিদিনের খাবারে পরিমিত পরিমাণে এটি যোগ করে বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যেতে পারে।
৪. শরীরের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে
বর্তমান সময়ে শরীরের ব্যথা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে।
গরম মসলার অন্যতম উপাদান এলাচ শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
৫. ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে
বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী রোগগুলোর মধ্যে ক্যানসার অন্যতম। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে মৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণের মধ্যে প্রায়ই ক্যানসারকে দেখা যায়।
গরম মসলার বিভিন্ন উপাদান ক্যানসার প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষ করে লবঙ্গ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। এতে থাকা কিছু উপাদান স্বাভাবিক কোষের কার্যক্রম বজায় রাখতে, টিউমারের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে এবং ফুসফুসের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
৬. মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে
প্রথমেই রয়েছে জায়ফল। ২০০৬ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, জায়ফলে থাকা ম্যাসেলিগনান নামের একটি যৌগ দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া লবঙ্গও মুখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। এটি মাড়ির প্রদাহ বা জিনজিভাইটিসের মতো সমস্যার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে, এলাচ দাঁতের ক্ষয় সৃষ্টিকারী অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
৭. পুষ্টি উপাদান শোষণে সহায়তা করে
অবিশ্বাস্য মনে হলেও খাবারে মসলা যোগ করলে শরীরের পুষ্টি উপাদান শোষণের ক্ষমতা বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে গরম মসলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো গোলমরিচ।
গোলমরিচে রয়েছে পাইপেরিন নামের একটি যৌগ, যা এর ঝাঁঝালো স্বাদের জন্য দায়ী।
পাইপেরিন খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করলে শরীরে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শোষণের মাত্রা বাড়তে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
এমনকি এই যৌগ কিছু ওষুধের কার্যকারিতাও বাড়াতে পারে। তবে এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধের সঙ্গে গোলমরিচ বা পাইপেরিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
৮. ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মসলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মসলাগুলোর একটি হলো দারুচিনি।
দারুচিনি সাধারণত মিষ্টি খাবার ও বিভিন্ন পেস্ট্রিতে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দারুচিনি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া জায়ফলেরও এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকারিতা রয়েছে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
৯. স্নায়ুতন্ত্রের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে
আলঝেইমারসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কমাতেও গরম মসলা সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে।
আগেই বলা হয়েছে, গরম মসলার প্রচলিত প্রায় সব উপাদানেই রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কোষকে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া গোলমরিচে থাকা পাইপেরিন স্নায়বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।
আলঝেইমারের মতো স্নায়বিক রোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের মতো এসব রোগের ঝুঁকিও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কিছুটা কমানো সম্ভব।
গরম মসলার এসব স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে গরম মসলা কোনো রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় নয়। সুস্থ থাকতে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।











































