Home স্বাস্থ্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের আগে জলপাই তেল কি উপকারী?

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের আগে জলপাই তেল কি উপকারী?

1


মিলি রহমান।।

শর্করাসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা প্রাথমিকভাবে দ্রুত বেড়ে যাওয়া কিছুটা কমতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণার ফলাফল থেকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রমাণিত উপায় হিসেবে খাবারের আগে অলিভ অয়েল খাওয়ার কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়া যায় না।

খালি পেটে অলিভ অয়েল পান করার প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেকে দাবি করেন, এটি ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, বার্ধক্যের গতি কমায় এবং সামগ্রিক সুস্থতায় সহায়তা করে। তবে এসব দাবির পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত।

ডায়াবেটিস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় গ্লুকোজগ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খেলে রক্তে চিনির নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা পরীক্ষা করেছেন গবেষকরা।

রক্তে শর্করার ওপর অলিভ অয়েলের প্রভাব কী?

ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় গবেষকরা গ্লুকোজ দেওয়ার ১৫ মিনিট আগে অলিভ অয়েল খাইয়েছিলেন। এরপর তাদের ফলাফলের সঙ্গে গ্লুকোজ দেওয়ার আগে পানি পান করানো ইঁদুর এবং গ্লুকোজ দেওয়ার পরে অলিভ অয়েল খাওয়ানো আরেকটি দলের ফলাফল তুলনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্লুকোজ গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খাওয়া ইঁদুরের রক্তে শর্করার মাত্রা প্রাথমিকভাবে তুলনামূলক কম বেড়েছে। গবেষকরা পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার প্রক্রিয়া, অর্থাৎ গ্যাস্ট্রিক হওয়ার গতিও ধীর হতে দেখেছেন।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুর এবং শরীরে ইনসুলিনের তীব্র ঘাটতি রয়েছে এমন ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে।

এ ছাড়া গবেষকরা গ্লুকাগন, গ্লুকোজ-নির্ভর ইনসুলিনোট্রপিক পলিপেপটাইড (জিআইপি) এবং গ্লুকাগন-সদৃশ পেপটাইড-১ (জিএলপি-১)-এর মতো অন্ত্রের হরমোনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। অলিভ অয়েল গ্রহণের ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে এসব পরিবর্তন দেখা যায়।

গবেষণার প্রধান লেখক জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের মতে, পুষ্টি উপাদানগুলো কী ক্রমে অন্ত্রে পৌঁছায়, তার ওপর ভিত্তি করে অন্ত্রের হরমোন ও স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এর ফলে রক্তপ্রবাহে গ্লুকোজ প্রবেশের গতিও প্রভাবিত হতে পারে।

তবে রক্তে শর্করার মাত্রা প্রাথমিকভাবে ধীরে বাড়ার অর্থ এই নয় যে শরীর মোট গ্লুকোজ কম শোষণ করছে।

মানুষের ওপর গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

মানুষের ওপর চালানো কয়েকটি সীমিত গবেষণায়ও একই ধরনের প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

পুষ্টিবিদ জেনিফার প্যালিয়ানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছয়জন পুরুষের ওপর একটি ছোট গবেষণা চালানো হয়েছিল। এতে তাঁদের কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে ৩০ মিলিলিটার অলিভ অয়েল পান করতে দেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, খাবারের আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর হয়, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে দেরি হয় এবং জিএলপি-১ হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, যারা পানি পান করেছিলেন কিংবা খাবারের সঙ্গে অলিভ অয়েল গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রভাবের ভিন্নতা দেখা গেছে।

এসব ফলাফল থেকে বোঝা যায়, খাবার গ্রহণের সময় ও ধারাবাহিকতা রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব কম হওয়ায় এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে কি অলিভ অয়েল?

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান গবেষণার ফলাফল খাবারের আগে অলিভ অয়েল গ্রহণকে ডায়াবেটিসের প্রমাণিত চিকিৎসা কিংবা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না।

এ বিষয়ে অধিকাংশ প্রমাণ এসেছে প্রাণীর ওপর চালানো পরীক্ষাগুলো থেকে। মানুষের ওপর গবেষণাও এখনো সীমিত। এই প্রভাব বাস্তবে উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যগত সুফল বয়ে আনে কি না, তা জানতে আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।

সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে অলিভ অয়েল গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এ অভ্যাসের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত ওষুধ কিংবা প্রতিষ্ঠিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত নয়।