একই দিনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে রিকশাচালক আহত, মাদক বিরোধে চাপাতির কোপে জখম যুবক
শামীম শিকদার।।
খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ রূপসা উপজেলার আঠারো বাকী নদী-সংলগ্ন একটি কলাবাগানের পাশ থেকে গুলিবিদ্ধ দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই দিনে মহানগরীর লবণচরা এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন এক রিকশাচালক। অন্যদিকে, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সোনাডাঙ্গার ডালমিল মোড়ে চাপাতির আঘাতে জখম হয়েছেন আরও এক যুবক। পৃথক এসব ঘটনায় নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের চরমোছাব্বরপুর গ্রামের হাবিবের কলাবাগানের উত্তর পাশ থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রূপসা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের আব্দুল্লাহর ছেলে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) এবং একই উপজেলার সিংহেরচর এলাকার আল আমিন হোসেন (৩০)। সোহাগ স্থানীয় জেলখানা ঘাটে মাঝি হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নদীর কাদার মধ্যে একটি মরদেহ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। কিছুক্ষণ পর একই স্থানে দ্বিতীয় মরদেহটি ভাসতে দেখা যায়। পরে তাঁরা রূপসা থানায় খবর দেন। সংবাদ পেয়ে বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানিয়েছে, নিহত মেহেদী হাসান সোহাগ স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, সোহাগ ও আল আমিন ওই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য বলে জানা গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা রয়েছে কি না, তা জানতে বিভিন্ন থানায় খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে রূপসা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর আলম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। নিহতদের মাথায় আঘাতের চিহ্ন কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তা ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান নদী থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার নেপথ্য কারণ ও মৃত্যুর সঠিক সময় জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে।
ছিনতাইকারীদের হামলায় রিকশাচালক আহত:
এদিকে, সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মহানগরীর লবণচরা থানাধীন তোতার ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রবি নামে এক রিকশাচালক গুরুতর আহত হয়েছেন। এ সময় তাঁর কাছ থেকে নগদ টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার বাসিন্দা রবি পেশায় রিকশাচালক। রাত সাড়ে ৮টার দিকে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ফেরার পথে তোতার ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। এ সময় দুই দুর্বৃত্ত তাঁর টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
রবির শ্বশুর জাবেদ জানান, ছিনতাইকারী দুজন ছিল। তারা রবিকে আঘাত করে মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। হামলাকারীদের শনাক্ত করা গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
মাদক বিরোধে চাপাতির কোপে যুবক জখম:
অন্যদিকে, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন ডালমিল মোড়ের ভেতরের একটি গলিতে মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে জাহিদুল ইসলাম (২৮) নামে এক যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে।
আহত জাহিদুল ইসলাম লবণচরা থানাধীন মোহাম্মদনগর এলাকার আবু হায়াতের ছেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে লবণচরা থানার সাচিবুনিয়া এলাকার সাগর (২৭) এবং তাঁর সঙ্গে থাকা আরও তিন থেকে চারজন অজ্ঞাত ব্যক্তি জাহিদুলের ওপর হামলা চালান। এ সময় ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচে আঘাত করা হয়। পরে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
স্থানীয়রা আহত জাহিদুলকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে তাঁকে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
কেএমপির বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টার দিকে ডালমিল মোড় এলাকায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত জাহিদুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচে কেটে যায়। এ ঘটনায় সোনাডাঙ্গা থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় বলে জানায়।
উল্লেখ্য, গত দুই দিনে খুলনা মহানগরীতে আরও দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সন্ধ্যায় আড়ংঘাটা থানার রায়মহল এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হন তাঁতী দল নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির। এর আগের দিন শনিবার রাতে নগরীর দারোগাপাড়া এলাকায় চাপাতির কোপে নিহত হন শহিদুল (৩৫) নামের এক যুবক।
এরপর রূপসায় নদী থেকে গুলিবিদ্ধ দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার এবং একই দিনে মহানগরীর দুটি এলাকায় ছিনতাই ও ধারালো অস্ত্রের হামলার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।











































