Home Lead খুলনায় ২৯৬ শিক্ষকের ১০ কলেজে পাস করেছে ২৬২ শিক্ষার্থী

খুলনায় ২৯৬ শিক্ষকের ১০ কলেজে পাস করেছে ২৬২ শিক্ষার্থী

6

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা লিংক সড়কের পাশে মেট্রোপলিটন কলেজ। ২০২৫ সালে কলেজটি থেকে ৬৫ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেন মাত্র ৬ জন। পরের বছর পরীক্ষার্থী কমে দাঁড়ায় ৪৬ জনে। পাস করেন ১০ জন। অথচ কলেজটিতে শিক্ষক রয়েছেন ২৯ জন। একই এলাকার আইডিয়াল কলেজেও ফলাফলের চিত্র হতাশাজনক। ১৬ জন শিক্ষকের এই কলেজে ২০২৫ সালে ৪৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৯ জন। ২০২৬ সালে ৭০ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৮ জন।

মহেশ্বরপাশা শহিদ জিয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ২০ জন। ২০২৫ সালে ৮২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন মাত্র ৭ জন। ২০২৬ সালে ৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৯ জন। অর্থাৎ দুই বছরেই কলেজটিতে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষকের অর্ধেকেরও কম।

এমন চিত্র শুধু এই তিনটি কলেজের নয়। খুলনার ১০টি বেসরকারি কলেজের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষকের সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুই বছরেই এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত পাসের হার ৩০ শতাংশের নিচে। ২০২৫ সালে ১ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৩১৭ জন। পাসের হার ২৬ শতাংশ। ২০২৬ সালে ১ হাজার ১১২ জনের মধ্যে পাস করেছেন ২৬২ জন। পাসের হার আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশে।


এ ১০ কলেজে শিক্ষক রয়েছেন ২৯৬ জন। অথচ ২০২৬ সালে পাস করেছেন ২৬২ শিক্ষার্থী। যা মোট মোট শিক্ষকের চেয়েও ৩৪ জন কম। ছয়টি কলেজে শিক্ষকের সংখ্যার চেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এর মধ্যে মেট্রোপলিটন কলেজে ২৯ জন শিক্ষকের বিপরীতে পাস করেছেন ১০ জন, শহীদ জিয়া কলেজে ২০ জনের বিপরীতে ৯ জন, সিটি গার্লস কলেজে ২৫ জনের বিপরীতে ১৩ জন, খুলনা কলেজে ৪২ জনের বিপরীতে ৩০ জন, হাজী আ. মালেক কলেজে ৩৩ জনের বিপরীতে ২২ জন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ৩৬ জনের বিপরীতে পাস করেছেন ৩৫ জন।

খুলনা কলেজে ৪২ জন শিক্ষক রয়েছেন। ২০২৫ সালে ১১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৩০ জন। ২০২৬ সালে ৮১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩০ জন। সিটি গার্লস কলেজে ২৫ জন শিক্ষকের বিপরীতে ২০২৫ সালে ৪৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ জন এবং ২০২৬ সালে ৩৬ জনের মধ্যে ১৩ জন পাস করেছেন।


রায়েরমহল কলেজে ২৩ জন শিক্ষকের বিপরীতে ২০২৫ সালে ৮৩ জনের মধ্যে পাস করেন ৩১ জন। ২০২৬ সালে ১০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২৫ জন। হাজী আ. মালেক কলেজে ৩৩ জন শিক্ষকের বিপরীতে ২০২৫ সালে ৪২ জন এবং ২০২৬ সালে ২২ জন পাস করেন। ইসলামিয়া কলেজে ৩৯ জন শিক্ষকের বিপরীতে দুই বছরেই পাস করেছেন ৪৬ জন করে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজেও ফলাফলের উন্নতি হয়নি। ৩৬ জন শিক্ষকের এই কলেজে ২০২৫ সালে ১৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৩৫ জন। ২০২৬ সালে ১৭৭ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩৫ জন। অন্যদিকে মুহসিন মহিলা কলেজে ৩৩ জন শিক্ষকের বিপরীতে ২০২৫ সালে ২৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৮৫ জন। ২০২৬ সালে ২৪৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৫৪ জন।

ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতিকে বড় সমস্যা বলে মনে করছেন মেট্রোপলিটন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা না গেলে ফলাফলে পরিবর্তন আনা কঠিন। তার ভাষায়, ‘শুধু ক্লাস করার জন্য আজকে ছেলেমেয়েরা কয়জন আসে? শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসে না। ক্লাসে আনার আগ পর্যন্ত আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন, কোনো পরিবর্তন সম্ভব না।’


খারাপ ফলের দায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায় বলে মনে করেন মহেশ্বরপাশা শহীদ জিয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম। তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা খারাপ করলে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানেরই বদনাম হয়। এ দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, এই বেতনের পাল্টা হিসাবে এই রাষ্ট্রকে আমরা কী দিচ্ছি? এই প্রশ্নটা করলে আমি যেমন ব্যথিত হচ্ছি, আমার সহকর্মীরাও ব্যথিত হবেন।

শিক্ষকতা শুধু অর্থ উপার্জনের পেশা নয়, এটিকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে নেয়ার ওপর জোর দেন তিনি। তারিকুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায়; তাদের প্রতি শিক্ষকদের আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকার বাড়াতে সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরী ও জেলার ৯টি উপজেলায় কলেজ রয়েছে ১০৫টি। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ১৫টি, সশস্ত্র বাহিনী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পরিচালিত কলেজ আটটি। বাকি ৮২টি বেসরকারি কলেজ।


২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় যশোর শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। খুলনার বেসরকারি কলেজগুলোর ফলাফল নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুতই এসব কলেজের প্রধানদের নিয়ে আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম।

বেসরকারি কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের শতভাগ সরকার দেয়। পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতাও দেয়া হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিবছর সরকারি তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি খসড়া হিসাব অনুযায়ী, ৩৫ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকলে একটি কলেজে মাসে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় হয় সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা। বছরে এই ব্যয় কোটি টাকার বেশি। এত অর্থ ব্যয়ের পরও শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে শিক্ষার মান, শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে।


শিক্ষাবিদ ড. খ ম রেজাউল করিম জানান, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কলেজ প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে না। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পরীক্ষার ফলাফলে। তিনি মনে করেন, কাছাকাছি এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিক্ষার্থী ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক কলেজ পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বদলে প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসের সময়ও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে যায়। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুরুত্ব কমছে, প্রভাব পড়ছে ফলাফলে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম জানান, বেসরকারি কলেজগুলোর ফলাফল নিয়ে আলোচনা করতে শিগগিরই প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে বসবে বোর্ড।

শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই একটি কলেজের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু শিক্ষক সংখ্যার তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থী কম, দুই বছর ধরে পাসের হার ৩০ শতাংশের নিচে, এমন পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও শিক্ষার মান নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।