বিশেষ প্রতিবেদন।।
নদীতে ভেসে উঠছে বিকৃত মরদেহ; কিংবা মহাসড়কের পাশে, রেললাইনের ধারে, জনমানবহীন ঝোপঝাড় ও নিভৃত লোকালয়ে মিলছে নিথর হাত-পা বাঁধা বস্তাবন্দি লাশ। পুলিশ উদ্ধার করছে, নিয়ম মাফিক ময়নাতদন্ত ও অপমৃত্যু বা নিয়মিত মামলা হচ্ছে—তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঢাকা পড়ে থাকছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি: ‘কে এই মৃত ব্যক্তি?’
শুধু পরিচয় মেলাতেই যেখানে ব্যর্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেখানে ঘাতকের সন্ধান কিংবা মৃত্যুর আসল কারণ উদঘাটন তো বহু দূরের কথা। তদন্তের ধীরগতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়হীনতায় একেকটি বেওয়ারিশ মরদেহের সাথে চিরতরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে একেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
গ্রাফে আতঙ্কজনক উর্ধগতি:
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত পৌনে চার বছরে সারাদেশে মোট ১ হাজার ৯৭৮টি ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৩ সাল: ৩৬২টি
২০২৪ সাল: ৫১০টি
২০২৫ সাল: ৬৪১টি
২০২৬ (আগস্ট পর্যন্ত): ৪৬৫টি
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালেই অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের হার বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। এদিকে শুধু রাজধানী ঢাকায় বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী সংস্থা ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’-এর হিসাব অনুযায়ী, উক্ত পৌনে চার বছরে ঢাকার জুরাইন ও রায়েরবাজার কবরস্থানে ২ হাজার ১০৪টি অজ্ঞাত লাশ দাফন করা হয়েছে।
নৌ-পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ ‘পচা-গলিত’ লাশ:
নৌ-পুলিশের তথ্যমতে, তাদের উদ্ধার করা অন্তত ৩০ শতাংশ মরদেহের পরিচয় কখনোই শনাক্ত করা যায় না। পানিতে দীর্ঘদিন ভেসে থাকার কারণে শরীর ফুলে যাওয়া, মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়া এবং আঙুলের চামড়া পচে যাওয়ার ফলে ডিজিটাল এনআইডি বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) ডেটাবেসে তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সবশেষ গত জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসে নৌ-পুলিশ উদ্ধার করেছে ১৭১টি লাশ, যার মধ্যে ৪৮টির পরিচয় আজও মেলেনি। এসব ঘটনার মধ্যে ১৫টি হত্যা মামলা ও ১৪০টি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হলেও রহস্য উদঘাটনে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।
যেসব কারণে তদন্তে গতি আসছে না:
অপরাধ বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত ও প্রযুক্তিগত ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
১. সমন্বিত ডেটাবেসের অভাব: সারাদেশে থানায় হওয়া নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি (জিডি), হাসপাতালের মর্গের তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক দ্রুত যাচাই করার মতো সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম এখনো গড়ে ওঠেনি।
২. ডিএনএ প্রক্রিয়ার ধীরগতি: বায়োমেট্রিক নিষ্ক্রিয় হলে একমাত্র ভরসা ডিএনএ প্রোফাইলিং; কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার সক্ষমতা সীমিত।
৩. আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি: বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের আগে মরদেহের ছবি, পোশাক, জন্মদাগ ও সুনির্দিষ্ট কবর নম্বর নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মত:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন—বেওয়ারিশ মরদেহের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সরাসরি নির্দেশ করে যে, অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। হত্যার পর পরিচয় গোপন করতে নদী বা নির্জন স্থানকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে সিন্ডিকেটগুলো।
একই সুর মানবাধিকার কর্মীদের কণ্ঠেও। তাঁদের মতে, একটি লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মানে কেবল একটি মামলার ফাইল বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি পরিবার সারাজীবনের জন্য তাদের নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় অনন্ত অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দ্রুত সমন্বিত ফরেনসিক ডেটাবেস ও পুলিশি তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে এ মৃত্যুর মিছিল ও তদন্তের স্থবিরতা কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়।











































