ঢাকা অফিস।।
সর্বাধিক অর্থ উপার্জনকারী বিশ্বখ্যাত মার্কিন অভিনেতা, প্রযোজক ‘রবার্ট ডাউনি জুনিয়র’কে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৯৯৯ সালে তিনি কারাভোগ করেন। বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা ড্যানি মাস্টারসনের ৩০ বছর কারদা- হয়েছে দুই নারীকে ধর্ষণের অপরাধে।
উপমহাদেশেও এমন দৃষ্টান্ত কম নেই। মুম্বাইয়ে বোমা হামলা মামলায় নাম আসা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন বলিউড তারকা সঞ্জয় দত্ত। ধর্ষণের দায়ে দ-িত হয়ে কারাভোগ করেন বলিউড অভিনেতা শাইনি আহুজা। আর ক্রিকেট কিংবদন্তি ইমরান খানকে তো কারাভোগ করতে হচ্ছে শুধুমাত্র রাজনীতি করার ‘অপরাধে’ ! এসবের অর্থ হচ্ছে, ‘খ্যাতি’ কিংবা অধিক অর্থ উপার্জন-কোনোটিই কোনো অপরাধীর অপরাধ সংঘটনের বৈধতা দেয় না।
অর্থ,বিত্ত,যশ,খ্যাতি-বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা। ‘খ্যাতি’ মানে অপরাধের অবাধ লাইসেন্স নয়। জনপ্রিয়তার অর্থ হচ্ছে আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া। রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে সকল বিতর্কের উর্ধ্বে রাখা। তার অবস্থান থাকবে সার্বজনীন। সার্বজনীন কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান তার ‘জনপ্রিয়তা’র পুরো পুঁজি নৈবেদ্য দিয়েছেন গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত শেখ হাসিনার পদমূলে। ফলে এখন তিনি ‘অল রাউন্ডার’ সাকিব আল হাসান নন। পরিগণিত হয়েছেন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আ’লীগ ও নিষিদ্ধ এ দলটির প্রধান মৃত্যুদ-প্রাপ্ত শেখ হাসিনার অনুগত,পদলেহী এক ঘৃণ্য অপরাধী হিসেবে। বিশ্বখ্যাত একজন অল রাউন্ডার হিসেবে বাংলাদেশ সরকার এতোদিন কিছুটা হলেও তার বিষয়ে নমনীয়তা দেখিয়েছে। যথাসাধ্য সম্মান দেখানোরও চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই সম্মানটুকু নিজেই যেন কেড়ে নিলেন পলাতক নি:সঙ্গ হাসিনার সঙ্গী হয়ে।
গত ৫ আগস্ট দিল্লীর গোপন আস্তানায় আশ্রয় নেয়া হাসিনার সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যুক্ত হন ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দিয়ে ‘আওয়ামীলীগার’ হয়ে যাওয়া সাকিব আল হাসান। চব্বিশের জুলাই গণহত্যা, শত শত শহীদ শিশু-নারী ও ছাত্র-জনতার শহীদদের আত্মদানকে ভ্রুক্ষেপই করলেন না। বরং ওই সময় হাসিনা যা করেছেন-সব কিছুর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে হাসিনাকে সাকিব বলেন, বাংলার মানুষ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা বিশ্বাস করে যে আপনি এই সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারবেন। মানুষের মুখে হাসি ও আশা ফিরিয়ে আনবেন! বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন আর ভালোবাসাকে পুঁজি করে রীতিমতো নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগার বনে যাওয়া সাকিব আল হাসানের সেকী ধৃষ্টতা !
মানুষ হয়তো ভেবেছিলো, হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামল দেখে অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসানও হয়তো বিভ্রান্ত হয়ে আওয়ামী টিকিটে এমপি বনে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিভ্রম আর ধোঁয়াশা কেটে এখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত ‘সাকিব আল হাসান’। যিনি জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণহত্যাকে ‘বৈধ’ এবং ‘সঠিক’ বলে মনে করেন। কোনো ধরণের দ্বিধা না করেই তিনি নিজের শরীরে জুলাই শহীদদের রক্ত মাখালেন।
হাসিনার জুলাই গণহত্যাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ার পর চেয়েছেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও। কী অদ্ভুত আবদার ! বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি এ আবদার করেন। নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগ না হলে আগামি ডিসেম্বরে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন-মর্মে মামা বাড়ির আবদারকেও হার মানিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আইন কী বলছে ? আইনজ্ঞরাই বা বলছেন কী ?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম গতকাল শনিবার বলেন, যতটা জানি, সাবেক আওয়ামী এমপি সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। একটি হচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিক রুবেল হত্যা মামলা। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর আদাবর থানায় এ মামলা হয়। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা,নিষিদ্ধ আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ১৫৬ জন এজাহারভুক্ত আসামি। এ মামলায় ২৮ নম্বর আসামি সাকিব আল হাসান। আরেকটি মামলা রয়েছে দুদকে। দু’টি মামলাই প্রচলিত আইনে সাধারণ আদালতে বিচারযোগ্য। তার বিষয়ে আর কোনো অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসেছে কি না-খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে। তবে অন্তত: এই টুকুন বলা যায় যে, আগামি ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাকিব আল হাসান যদি দেশে ফেরেন, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
.
…..
এদিকে সাকিব আল হাসানের আইনি পরিণতি সম্পর্কে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ মো: মঈদুল ইসলাম বলেন, আমলযোগ্য ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তার হাতে অবাধ ক্ষমতা। আসামি হিসেবে কোনো ধরণের ওয়ারেন্ট ছাড়াই সাকিব আল হাসানের দেখা পাওয়ামাত্র পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। যদি তিনি গোপনে দেশে ফেরেন, তাহলে দেশের অভ্যন্তরে যেখানেই তাকে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই গ্রেফতার করা যাবে। তিনি যদি ‘পলাতক’ অবস্থায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তাহলে যে দেশে আছেন, সেই দেশ থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায়ও সরকার ফিরিয়ে আনতে পারে।
সিনিয়র এ জেলা জজের মতে, যেহেতু সাকিব আল হাসান এজাহারভুক্ত আসামি, সেহেতু আইও. ইচ্ছে করলে তদন্ত পর্যায়েও গ্রেফতার করতে পারেন।
তিনি বলেন, শুধু হত্যা মামলা নয়। সম্ভবত তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও মামলা রয়েছে। দুদকও তাকে গ্রেফতার দেখাতে পারে। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশে একমাত্র আইনি পরিণতি। ক্রিকেটার, অলরাউন্ডার কিংবা জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে আইনের বাইরে তাকে সুযোগ দানের সুযোগ নেই। আইন যদি তাকে ‘আসামি’ হিসেবে সাব্যস্ত করে, তাহলে তিনি আসামি। আদালত যদি তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন, তাহলে তিনি অপরাধী। এটিই তার পরিচয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে তো কারাগারে যেতেই হবে। কারাগারই হবে তার ঠিকানা।
এদিকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো: আমিনুল হক বলেছেন, সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরার স্বাভাবিক কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশে ফিরে আবারো লাল-সবুজ জার্সি জড়িয়ে বাংলাদেশের মাটিতে খেলার সুযোগও তিনি হারালেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন ক্রিকেটার হিসেবে সরকারের দিক থেকে এতদিন বিষয়টি নমনীয়ভাবে দেখা হচ্ছিলো। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। সাকিব স্বৈরাচারের সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। যদি সাকিব দেশে আসেন, তাহলে আইনগতভাবেই আসতে হবে।
প্রসঙ্গত: সাকিব আল হাসান দ্বাদশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নৌকা প্রতীক নিয়ে মাগুরা-১ আসনে ‘আমি-ডামি নির্বাচনে’ এমপি নির্বাচিত হন। ৫ আগস্ট তার নেত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে সাকিব আল হাসানকেও দেশের মাঠের কোনো খেলায় দেখা যায় নি। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলাটির এখনো চার্জশিট হয়নি। এ ছাড়া কারসাজির মাধ্যমে দেশের শেয়ার বাজার থেকে ২৫৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে করা মামলা রয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। কমিশনের অনুমোদন পেলেই মামলাটির চার্জশিট দাখিল করা হবে-মর্মে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো: আকতারুল ইসলাম বলেন, মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। এখন শেষ ধাপের কিছু প্রক্রিয়া চলছে। এটি শেষ হলেই দ্রুত চার্জশিট দাখিল করা হবে আদালতে।
এজাহারের তথ্য মতে, এ মামলায় সাকিব আল হাসান ছাড়াও তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের, আবুল কালাম মাদবর, কনিকা আফরোজ, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর,আলেয়া বেগম, কাজী ফুয়াদ হাসান, কাজী ফরিদ হাসান, জাভেদ এ মতিন, জাহেদ কামাল, হুমায়ুন কবির ও তানভীর নিজামকে আসামি করা হয়েছে। আসামীদের অধিকাংশই সাকিব আল হাসানের পরিবারের সদস্য-স্বজন ও নিকটাত্মীয়।











































