স্পোর্টস ডেস্ক
ওয়ানডে ক্রিকেটকে বলা যায় ক্রিকেটের পরীক্ষাগার। তৃতীয় আম্পায়ার, রাতের ক্রিকেট, সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা ব্যবস্থা বা ডিআরএসসহ আধুনিক ক্রিকেটের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন প্রথমবারের মতো এই সংস্করণেই পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া মেলবোর্ন টেস্টের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪৬ হাজার দর্শকের সামনে হঠাৎ একটি সীমিত ওভারের ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে যে ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকের খেলাটি তার চেয়ে প্রায় সব দিক থেকেই আলাদা।
পুরুষদের এক দিনের ক্রিকেটের ৫ হাজারতম ম্যাচের মাইলফলকে দাঁড়িয়ে দেখে নেওয়া যাক, সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে গেছে এই সংস্করণের খেলার নিয়ম ও পরিবেশ।
ওভারের সংখ্যা
বর্তমান সময়ের ক্রিকেটারদের, বিশেষ করে ব্যাটারদের কাছে এক দিনের ম্যাচ ৪০ ওভারে নামিয়ে আনার কথা শুনলেই আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। অথচ এই সংস্করণের ম্যাচের দৈর্ঘ্য সময়ের সঙ্গে বারবার বদলেছে।
প্রথম এক দিনের ম্যাচটি ছিল ৪০ ওভারের। তবে তখন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে প্রতি ওভারে আটটি করে বল করা হতো। ফলে একসময় এক দিনের ক্রিকেটের দুটি আলাদা ধরন ছিল। দক্ষিণ গোলার্ধে ৪০ ওভারে আটটি করে বল এবং ইংল্যান্ডে ৫৫ ওভারে ছয়টি করে বল।
১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে প্রতি ইনিংসে ৬০ ওভার করে খেলা হয় এবং প্রতিটি ওভারে ছিল ছয়টি বল। বিশ্বকাপের পর নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার পথ থেকে সরে গিয়ে আট বলের ৩৫ ওভারের ম্যাচ আয়োজন শুরু করে। ফলে এক দিনের ক্রিকেটে তিন ধরনের ম্যাচ চালু হয়ে যায়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাইরে প্রথম এক দিনের ম্যাচ আয়োজনকারী দেশ পাকিস্তানও নিউজিল্যান্ডের নিয়ম অনুসরণ করে ৩৫ ওভারের ম্যাচ আয়োজন করেছিল।
১৯৭৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারবিস, গায়ানায় পৌঁছানোর পর এক দিনের ক্রিকেটে যোগ হয় চতুর্থ ধরন। সেখানে খেলা হয় ৪৫ ওভারের, প্রতি ওভারে ছয়টি বল।
১৯৭৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এমন একটি নিয়ম চালু করে, যা পরবর্তী সময়ে এক দিনের ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধরন হয়ে ওঠে—প্রতি ইনিংসে ৫০ ওভার, প্রতি ওভারে ছয়টি বল। তবে সেন্ট জনস, অ্যান্টিগায় আলো স্বল্পতার কারণে একটি ম্যাচ শেষ করা সম্ভব হয়নি। সেদিন কীভাবে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি ছিল আরও একটি নিয়মের দীর্ঘ বিবর্তনের সূচনা।
১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার নিয়ম বাদ দিয়ে প্রতি ইনিংসে ৪০ ওভারের ম্যাচ শুরু করে। ইংল্যান্ড তখনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ৫৫ ওভার খেলছিল। ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপে আবার প্রতি ইনিংসে ৬০ ওভার রাখা হয়।
এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় কেরি প্যাকারের বিশ্ব সিরিজ ক্রিকেট ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় এক দিনের ম্যাচকে ৫০ ওভারে নামিয়ে আনেন। ১৯৭৯ বিশ্বকাপের পর অস্ট্রেলিয়া গ্রীষ্মে বহু দেশের অংশগ্রহণে ওয়ার্ল্ড সিরিজ কাপ আয়োজন শুরু করে এবং ৫০ ওভারের নিয়ম ধরে রাখে। নিউজিল্যান্ডও একই নিয়ম অনুসরণ করে।
ফলে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৫০ ওভারের ম্যাচ চালু হয়ে যায়। ইংল্যান্ড ৫৫ ওভার এবং পাকিস্তান ৪০ ওভারেই থেকে যায়।
১৯৮১-৮২ মৌসুমে ভারতও শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারের নিয়ম গ্রহণ করে। কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচই সময়মতো শুরু করা যায়নি। তিনটিই শুরুতেই সংক্ষিপ্ত করতে হয় এবং শেষে আলো স্বল্পতার সমস্যায় পড়তে হয়। একই মৌসুমে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া শ্রীলঙ্কা প্রথম এক দিনের ম্যাচ আয়োজন করে ৪৫ ওভারের।
১৯৮৩ বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৫০ ওভারে স্থির হয়। পাকিস্তান ৪০, শ্রীলঙ্কা ৪৫ এবং ইংল্যান্ড ৫৫ ওভারে খেলছিল। অন্তত তখন প্রতি ওভারে বলের সংখ্যা এক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৩ বিশ্বকাপে আবার ৬০ ওভারের ম্যাচ ফিরে আসে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ১৯৮৩ সালের শীতেই ভারত নিয়মিতভাবে ৫০ ওভারের ম্যাচ আয়োজন শুরু করে। কিন্তু শীতের সময় ৫০ ওভার আয়োজনের সিদ্ধান্তটি তখন বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলা সাতটি ম্যাচের একটিও সময়মতো শুরু হয়নি। ফলে প্রতিটি ম্যাচই সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছিল।
১৯৮৪ সালে শারজাও ৫০ ওভারের ম্যাচ আয়োজনের চেষ্টা করে একই সমস্যায় পড়ে। দিনের আলো শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাচ শেষ করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে নাগপুরে ১৬তম প্রচেষ্টায় ভারত প্রথমবার পুরো ৫০ ওভারের একটি ম্যাচ আয়োজন করতে সক্ষম হয়। একই বছরের মার্চে শারজাও ৫০ ওভারের ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী দিনের দৈর্ঘ্য খুঁজে পায়।
১৯৮৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান ৫০ ওভারের ম্যাচে ফিরে আসে এবং ১৯৮৭ বিশ্বকাপ আয়োজন করে। সেটিই ছিল ইংল্যান্ডের বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ এবং বর্তমান পরিচিত ৫০ ওভারের দৈর্ঘ্যের প্রথম বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের পর অবশ্য পাকিস্তান আবার ৪০ ওভারে ফিরে যায়।
১৯৮৮ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ নতুন এক দিনের ম্যাচ আয়োজনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরুতে বাংলাদেশে ৪৫ ওভারের ম্যাচ খেলা হতো। ১৯৯২ সালের আগস্টে শ্রীলঙ্কাও ৫০ ওভারের নিয়ম গ্রহণ করে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড প্রথমবার বিশ্বকাপে দিন-রাতের ম্যাচ আয়োজন করেছিল। একই বছর দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে প্রথমবার এক দিনের ক্রিকেট আয়োজন করে এবং দুটিই ৫০ ওভারের নিয়ম গ্রহণ করে।
১৯৯৪ সালের শীতে পাকিস্তানও ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ফিরে আসে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের ব্যাপক সাফল্যের পর ইংল্যান্ডও শেষ পর্যন্ত একই নিয়ম গ্রহণ করে। ফলে এক দিনের ক্রিকেটে সর্বত্র ৫০ ওভারের নিয়মই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের পর বিভিন্ন নিরপেক্ষ ভেন্যুতেও ৫০ ওভারের ম্যাচ চালু হয়। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে আবার এক দিনের ক্রিকেট ফিরলেও তখন ৫০ ওভারের নিয়মই অনুসরণ করা হয়।
সংক্ষিপ্ত ম্যাচ ও বৃষ্টির নিয়ম
বৃষ্টি ও আলো স্বল্পতাই ছিল এক দিনের ম্যাচ শেষ না হওয়ার প্রধান কারণ। ইংল্যান্ডে গ্রীষ্মকালে দিনের আলো দীর্ঘ সময় থাকায় তারা কিছুটা সুবিধায় ছিল। দীর্ঘদিন সেখানে ম্যাচ বন্ধ হয়ে গেলে পরের দিনে খেলা চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ফলে নাম এক দিনের ম্যাচ হলেও অনেক ম্যাচ প্রকৃত অর্থে এক দিনের মধ্যে শেষ হতো না।
১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে ইংল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচ প্রথমবার খারাপ আবহাওয়ার মুখে পড়ে। তখন কোনো সংরক্ষিত দিন ছিল না। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে ঝড় এসে মাঠ জলাবদ্ধ করে ফেললেও ইংল্যান্ডের ইনিংস কমানো হয়নি। নিয়ম ছিল সরল—ইংল্যান্ড পুরো ইনিংস খেলবে এবং নিউজিল্যান্ডকে অন্তত ৩০ ওভার খেলা সম্ভব হলে তার চেয়ে ভালো রান তোলার হার বজায় রাখতে হবে। পরে দ্বিতীয় দফা ঝড়ে ইংল্যান্ডও পুরো ইনিংস শেষ করতে পারেনি। সেটিই ছিল প্রথম ফলহীন এক দিনের ম্যাচ।
ইংল্যান্ডের বাইরে অন্য দেশগুলো সুযোগ পেলে দুই দলের ইনিংসই কমিয়ে দিত। তবে নিউজিল্যান্ড প্রথমদিকে সংরক্ষিত দিন বা আলো স্বল্পতার জন্য আলাদা কোনো নিয়মও রাখেনি। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম এক দিনের ম্যাচে পাকিস্তানকে প্রবল অন্ধকার ও হালকা বৃষ্টির মধ্যেই ব্যাট করতে হয়েছিল।
ইংল্যান্ডের বাইরে ম্যাচের ন্যূনতম দৈর্ঘ্য ১৫ ওভারে নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে একটি সফর শুরুর আগেই দুই দলকে এ বিষয়ে সম্মত হতে হতো। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে চণ্ডীগড়ে এর একটি উদাহরণ দেখা যায়। ভেজা মাঠের কারণে ম্যাচ ১৫ ওভারে নেমে আসে। ইংল্যান্ড ৬ উইকেটে ১২১ রান করে, ভারত ৭ রানে হেরে যায়। খুব অল্প ওভারে সেটি প্রায় টি-টোয়েন্টির মতো রান তোলার হার তৈরি করেছিল।
সেই বছরই কলম্বোর পি সারা ওভালে ভারত ৪০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৯৪ রান করে। আলো দ্রুত কমে আসায় শ্রীলঙ্কার লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৫ ওভারে ৭২ রান। কিন্তু ৯.২ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ৩২ রান করার পর শ্রীলঙ্কা আলো স্বল্পতার সুবিধা নিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেয় এবং ম্যাচটি ফলহীন হয়।
রান তোলার হারের নিয়মের পাশাপাশি আশির দশকে তুলনামূলক স্কোরের নিয়মও ব্যবহার করা হতো। এর দুটি ধরন ছিল। একটি নিয়মে নির্দিষ্ট সময়ে প্রথমে ব্যাট করা দলের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হতো। অন্য নিয়মে প্রথম দলের শেষ ৪৫ ওভারে করা রানের চেয়ে বেশি রান করতে হতো।
তখন কোনো একক নিয়ম ছিল না। প্রতিটি সফরের আগে আলাদা নিয়ম ঠিক করা হতো। অনেক সময় অধিনায়করাও নিয়ম জানতেন না। ১৯৯১ সালের অক্টোবরে শারজায় ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে আলো কমে গেলে মাঠের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ভারতীয় অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনও জানতেন না কী নিয়ম প্রযোজ্য। এমনকি অতিরিক্ত আম্পায়ারও জানতেন না। শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামের বাইরের সড়কের বাতি জ্বালিয়ে ম্যাচ শেষ করতে হয়েছিল। ওয়াকার ইউনিসের শেষ ওভারে ১২ রান নেওয়া স্বাভাবিক আলোতেও কঠিন কাজ, সেখানে এমন পরিস্থিতিতে সেটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
১৯৯২ বিশ্বকাপে অন্তত নিয়ম নিয়ে আর অনিশ্চয়তা ছিল না। আগের সরল রান তোলার হারের নিয়মে রান তাড়া করা দল সুবিধা পেত। তাই রিচি বেনোর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি নতুন নিয়ম তৈরি করে। কোনো দলের ইনিংস শেষ হওয়ার পর ম্যাচ সংক্ষিপ্ত হলে, দুই দল অন্তত ১৫ ওভার করে ব্যাট করার সুযোগ পেলে প্রথম দলের কম রান করা ওভারগুলো বাদ দিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতো।
ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের রান তাড়ায় তিন ওভার কমে গেলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থেকে দুটি মেডেন ও একটি দুই রানের ওভার হিসাব করে লক্ষ্য মাত্র দুই রান কমানো হয়েছিল।
তবে এই নিয়ম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের সময়সূচির সীমাবদ্ধতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে এই নিয়মের জটিলতায় পড়ে।
এর পর অস্ট্রেলিয়া ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের নিয়মে নিজেদের মতো পরিবর্তন আনে। প্রথমে ব্যাট করা দলের সবচেয়ে বেশি রান করা ওভারগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি হারানো ওভারের জন্য শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ করে কমানো হতো।
১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল একটি অভিন্ন নিয়ম তৈরি করে। সংক্ষিপ্ত রান তাড়ায় নির্দিষ্ট ওভারে তাড়া করা দলের জন্য নির্ধারিত শতাংশে রান করতে হতো। ২৫ ওভারে এই হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২৬ ওভারে ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২৭ ওভারে ৭০ দশমিক ২ শতাংশ। ধীরে ধীরে হার বাড়তে বাড়তে ৫০ ওভারে ১০০ শতাংশে পৌঁছাত।
এর অর্থ ছিল, অর্ধেক ওভারে রান তাড়া করলে দ্বিতীয় দলকে মূল লক্ষ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রান করতে হতো। প্রথম দল পুরো ওভার খেলতে না পারলেও একই অনুপাতে তাদের রান সমন্বয় করা হতো।
তবে এই ব্যবস্থায় উইকেট হারানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতো না। অস্ট্রেলিয়া এই নিয়মে সন্তুষ্ট ছিল না এবং ১৯৯২ বিশ্বকাপের নিজেদের পরিবর্তিত নিয়মই অনুসরণ করতে থাকে।
অবশেষে ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রথমবার এক দিনের ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে ওভার ও উইকেট—দুটিকেই সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং দ্বিতীয় ইনিংসের যেকোনো সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক উইকেট হারানোর পর সমানুপাতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্ধতিটি গ্রহণ করে।
পরবর্তী সময়ে পদ্ধতিটি আরও উন্নত করা হয়। পরিসংখ্যানবিদ স্টিভেন স্টার্ন এতে নতুন সংযোজন করেন। ফ্র্যাঙ্ক ডাকওয়ার্থ ও টনি লুইসের তৈরি পদ্ধতিই পরে পরিণত হয় বর্তমান ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে।
বলের বিবর্তন
প্রথম চারটি বিশ্বকাপ লাল ডিউক বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। এরপর ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সাদা কুকাবুরা বল এবং দিন-রাতের ম্যাচ চালু করে। ১৯৯৬ সালে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও একই পথে যায়।
বিশ্ব সিরিজ ক্রিকেটের সময় থেকেই অস্ট্রেলিয়া সাদা কুকাবুরা ব্যবহার করছিল। রাতের ক্রিকেট চালু হওয়ার পর লাল বল ফ্লাডলাইটের নিচে ঠিকমতো দেখা যেত না। তাই সাদা বলের প্রয়োজন হয়েছিল।
১৯৯২ বিশ্বকাপের সময়ও ইংল্যান্ড লাল বল ব্যবহার করত। টেস্ট ও এক দিনের ম্যাচে টস জেতা দল রিডার্স বা ডিউক—এই দুটি বলের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারত। ১৯৯২ সালের উত্তপ্ত গ্রীষ্মে পাকিস্তান পাঁচটি টেস্ট ও পাঁচটি এক দিনের ম্যাচ খেলেছিল। এর মধ্যে আটটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে রিডার্স বল এবং দুটি ম্যাচে ডিউক বল ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৯৯৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ সাদা ডিউক বলে খেলা হয়। বলটি প্রচুর সুইং করায় ওই বিশ্বকাপে অনেক কম রান হয়েছিল।
২০০১ সালের মধ্যে দিন কিংবা রাত—সব এক দিনের ম্যাচেই রঙিন পোশাক চালু হয়ে যায়। ফলে লাল বল আর ব্যবহারযোগ্য থাকেনি। লাল বল ও সাদা পোশাকে সর্বশেষ এক দিনের ম্যাচটি হয়েছিল ২০০০ সালের ডিসেম্বরে রাজকোটে ভারত ও জিম্বাবুয়ের মধ্যে।
২০০৩ বিশ্বকাপে এক দিনের ক্রিকেটের খেলার নিয়ম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের অধীনে চলে আসে। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে যে সাদা কুকাবুরা বল ব্যবহার করত, সেটিই বেছে নেওয়া হয়। ইংল্যান্ডও ওই বলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজেদের দেশে সাদা কুকাবুরা ব্যবহার শুরু করে।
এভাবেই সাদা কুকাবুরা এক দিনের ক্রিকেটের প্রায় সর্বজনীন বল হয়ে ওঠে।
তবে কোনো বল প্রস্তুতকারকই এমন সাদা বল তৈরি করতে পারেনি, যা পুরো ৫০ ওভার ভালোভাবে টিকে থাকবে। সাধারণত ৩৪ বা ৩৫ ওভারের পর বল এতটাই ময়লা হয়ে যেত যে সেটি দেখা কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই বল বদলাতে হতো।
এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এক ইনিংসে দুটি সাদা বল ব্যবহারের নিয়ম চালু করে। দুই প্রান্ত থেকে একটি করে বল ব্যবহার করা হতো।
কিন্তু এতে নতুন সমস্যা তৈরি হয়। বল দুটি যথেষ্ট পুরোনো না হওয়ায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এক দিনের ক্রিকেটে রিভার্স সুইং বা স্পিন পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল নিয়মে পরিবর্তন আনে। ৩৪ ওভার পর ফিল্ডিং করা দলকে দুটি বলের যেকোনো একটি বেছে নিয়ে বাকি ইনিংসে সেটি ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে একটি বল সর্বোচ্চ ৩৩ ওভার পর্যন্ত ব্যবহৃত হতে পারে।
ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধ
এক দিনের ক্রিকেটে ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রথম ১০ বছরে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেট ছাড়া আর কোনো জায়গায় নিয়মিত ফিল্ডিং বিধিনিষেধ ছিল না। কেরি প্যাকার বিশ্ব সিরিজ ক্রিকেটে এই নিয়ম চালু করেন। এরপর ১৯৮০-৮১ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে।
উদ্দেশ্য ছিল অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজানো ঠেকানো এবং নতুন বলের বিরুদ্ধেও ব্যাটারদের আক্রমণাত্মক শট খেলতে উৎসাহিত করা।
১৯৭৯ সালে সিডনিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য শেষ বলে তিন রান প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি তখন তার ১০ জন ফিল্ডারকেই সীমানার কাছে দাঁড় করিয়ে দেন। এমনকি উইকেটরক্ষককেও সীমানায় পাঠানো হয়েছিল।
আশির দশকজুড়ে দুই দল সম্মত হলেই ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধ কার্যকর হতো। ১৯৮১ সালে ভারতে প্রথম এক দিনের ম্যাচ আয়োজনের সময় ইংল্যান্ড পুরো ইনিংসেই বিধিনিষেধ চেয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রথম ১৫ ওভারের জন্য তা সীমাবদ্ধ রাখে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।
১৯৯২ বিশ্বকাপ ছিল প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে ফিল্ডিংয়ের বিধিনিষেধ অভিন্নভাবে কার্যকর করা হয়। ইনিংসের প্রথম ১৫ ওভারে ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে সর্বোচ্চ দুইজন ফিল্ডার থাকতে পারতেন। বাকি সময়ে থাকতে পারতেন সর্বোচ্চ পাঁচজন।
এর ফলে শুরুতে দ্রুত রান তোলার জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যাটারকে নামানোর প্রবণতা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে দলের সবচেয়ে দক্ষ ব্যাটারদের ইনিংসের শুরুতে পাঠানোর পথও তৈরি হয়। শচীন টেন্ডুলকার ও মার্ক ওয়াহ এর বড় উদাহরণ।
প্রথমদিকে প্রথম ১০ ওভারে উইকেটরক্ষক ছাড়াও দুজন ক্যাচিং ফিল্ডার রাখার নিয়ম ছিল। তাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক এড়াতে দুই প্রান্তের উইকেটকে কেন্দ্র ধরে ১৫ গজের দুটি বৃত্ত আঁকা হতো। ক্যাচিং ফিল্ডারকে ওই বৃত্তের মধ্যে থাকতে হতো। ২০১৫ সালে এই নিয়ম বাতিল করা হয়।
২০০৫ সালে ফিল্ডিং বিধিনিষেধের পরিবর্তে শক্তি-পর্ব বা পাওয়ারপ্লের ধারণা চালু হয়। প্রথম ১০ ওভার ছিল বাধ্যতামূলক শক্তি-পর্ব। বাকি দুটি পাঁচ ওভারের পর্ব কখন ব্যবহার করা হবে, সেটি নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয় ফিল্ডিং করা দলকে।
২০০৮ সালে ব্যাটিং দল দুটি ঐচ্ছিক শক্তি-পর্বের একটির সময় নির্ধারণের সুযোগ পায়। একই সময়ে ঐচ্ছিক শক্তি-পর্বে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে তিনজন ফিল্ডার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
২০১১ সালে এই পর্বগুলো কেবল ১৬ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যে নেওয়ার নিয়ম করা হয়।
২০১২ সালে শক্তি-পর্বের বাইরের ওভারগুলোকে আরও আক্রমণাত্মক করতে ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে ফিল্ডারের সংখ্যা পাঁচ থেকে কমিয়ে চার করা হয়। এর বিনিময়ে বোলিং শক্তি-পর্ব বাতিল করা হয়। ব্যাটিং শক্তি-পর্বে সর্বোচ্চ তিনজন ফিল্ডার বৃত্তের বাইরে থাকতে পারতেন এবং তা ৪০ ওভারের মধ্যে শেষ করতে হতো।
২০১৫ সালে ব্যাটিং শক্তি-পর্বও বাতিল করা হয়। শেষ ১০ ওভারে বৃত্তের বাইরে সর্বোচ্চ পাঁচজন ফিল্ডার রাখার নিয়ম করা হয়। বাধ্যতামূলক শক্তি-পর্বে দুজন ক্যাচিং ফিল্ডার রাখার নিয়মও বাতিল করা হয়।
এগুলোই বর্তমানে এক দিনের ক্রিকেটে ফিল্ডিংয়ের প্রচলিত বিধিনিষেধ।
টাই হলে বিজয়ী নির্ধারণ
প্রথম টাই হওয়া এক দিনের ম্যাচটি শেষ হয়েছিল বড় ধরনের বিতর্কের মধ্য দিয়ে।
১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে তিন ম্যাচের ফাইনাল সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে দুই দলের রান সমান হয়। এতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। তাদের ধারণা ছিল তৃতীয় ফাইনাল আর খেলার প্রয়োজন নেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া জিতলেও সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হতো এবং লিগ পর্বে ভালো ফলের কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজই ট্রফি পেত।
পরেরবার কোনো এক দিনের ম্যাচ টাই হলে দুটি নিয়ম চালু ছিল—কোন দল কম উইকেট হারিয়েছে এবং দুই দল সমান উইকেট হারালে ২৫ ওভারের পর কোন দলের রান বেশি।
হায়দরাবাদে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের ম্যাচে শেষ বলে দ্বিতীয় রান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আবদুল কাদির। রানআউট হয়ে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ২১২। ফলে ভারত জয় পায়। অথচ কাদির যদি এক রান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন, পাকিস্তান ২৫ ওভারে বেশি রান করার কারণে ম্যাচ জিতে যেত।
১৯৮৮ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাই হওয়া ম্যাচে পাকিস্তান অবশ্য এই নিয়মের সুবিধা পায়। শেষ ওভারের প্রথম বলেই দুই দলের রান সমান হয়ে যায়। এরপর ওয়াসিম আকরাম পরপর তিনটি বল খেলেন। শেষ বলে আবদুল কাদির এলবিডব্লিউ থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। ফলে পাকিস্তান এক উইকেটের ব্যবধানে টাইব্রেকারে জয় পায়।
১৯৮৯ সালের মধ্যে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্ব ছাড়া টাইব্রেকারের নিয়ম তুলে দেওয়া হয়। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ টাই হওয়ার পর আগের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় পাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে ওঠে।
২০১১ বিশ্বকাপ থেকে নকআউট ম্যাচে টাই হলে টি-টোয়েন্টির মতো সুপার ওভার চালু করা হয়।
২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে নির্ধারিত ওভার ও সুপার ওভার—দুটিই টাই হওয়ার পর বাউন্ডারি গণনা করে ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর নিয়ম বদলে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি যতক্ষণ অনুমতি দেবে, ততক্ষণ একের পর এক সুপার ওভার খেলার বিধান করা হয়।
২০২৩ সালে সুপার ওভারকে শুধু বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে নয়, যেকোনো এক দিনের ম্যাচ টাই হলে বাধ্যতামূলক টাইব্রেকার হিসেবে চালু করা হয়।
সুপার সাবের পরীক্ষা
আইপিএলের প্রভাবশালী খেলোয়াড়ের নিয়মেরও আগে এক দিনের ক্রিকেটে চালু হয়েছিল সুপার সাবের ধারণা।
টসের সময় দলগুলোকে ১১ জন খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন সুপার সাবের নাম ঘোষণা করতে হতো। ম্যাচের যেকোনো সময় একজন খেলোয়াড়কে সরিয়ে সেই সুপার সাবকে মাঠে নামানো যেত।
ভিক্রম সোলাঙ্কি ছিলেন প্রথম সুপার সাব। তবে পরীক্ষাটি এক বছরও টেকেনি এবং দ্রুতই বাতিল হয়ে যায়।











































