স্পোর্টস ডেস্ক
অ্যাশেজে তৃতীয় সেঞ্চুরিসহ দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা পুরুষ ক্রিকেটারের পুরস্কার অ্যালান বোর্ডার পদক জিতেছেন ট্রাভিস হেড। হাড্ডাহাড্ডি ভোটের লড়াইয়ে মাত্র এক ভোটে ঘনিষ্ঠ বন্ধু অ্যালেক্স ক্যারিকে পেছনে ফেলেছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। মিচেল স্টার্কের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন তিন ভোটে।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আট মাস পর শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রিসবেনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের হাত থেকে দ্বিতীয়বারের মতো এই পদক গ্রহণ করেন হেড।
মিচেল স্টার্ক পেয়েছেন শেন ওয়ার্ন বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কার। প্রয়াত স্পিনার শেন ওয়ার্নের বাবা কিথ ওয়ার্ন তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে বর্ষসেরা হয়েছেন মিচেল মার্শ এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পুরস্কার জিতেছেন টিম ডেভিড। ব্রিসবেন নদীর তীরে ঘরোয়া পরিবেশে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি।
২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার পুরুষ দলের সেরা খেলোয়াড়দের স্বীকৃতি দেওয়ার এই অনুষ্ঠানটি বেশ দেরিতে অনুষ্ঠিত হলো। ভোটের সময়কাল ছিল ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। দুই জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচির কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে পুরস্কার অনুষ্ঠান আয়োজনের উপযুক্ত সময় খুঁজে পায়নি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
নারীদের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার বেলিন্ডা ক্লার্ক পদক অবশ্য ফেব্রুয়ারিতে সিডনিতে অনুশীলন শুরুর আগে অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আনুষ্ঠানিক কোনো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট পুরস্কার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়নি।
অ্যালান বোর্ডার পদকের ভোট
ট্রাভিস হেড — ১৫৩ ভোট
অ্যালেক্স ক্যারি — ১৫২ ভোট
মিচেল স্টার্ক — ১৫০ ভোট
স্টিভ স্মিথ — ৯৬ ভোট
মিচেল মার্শ — ৮৬ ভোট
গত বছর অ্যালান বোর্ডার পদকের দৌড়ে হেড অনেকটাই এগিয়ে থেকে জয় পেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত বিভিন্ন সংস্করণের প্রায় সব পুরস্কারও জেতার কাছাকাছি ছিলেন তিনি। এবার অবশ্য জয়টি এসেছে খুব অল্প ব্যবধানে। খেলোয়াড়, আম্পায়ার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ভোটে শেষ পর্যন্ত এক ভোটের ব্যবধানে ক্যারিকে এবং তিন ভোটে স্টার্ককে পেছনে ফেলেছেন তিনি।
ভোটের সময়সীমার শেষ ম্যাচ, সিডনিতে অনুষ্ঠিত নববর্ষের টেস্টে হেডের দুর্দান্ত ব্যাটিংই সম্ভবত তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। ওই ম্যাচে তিনি ১৬৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। অ্যাশেজ সিরিজে এটি ছিল তার তৃতীয় শতক। সেই সিরিজেই প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওপেনার হিসেবে খেলতে শুরু করেন তিনি।
সিডনির সেই ম্যাচে স্টিভ স্মিথ করেছিলেন ১৩৮ রান। বিউ ওয়েবস্টার অপরাজিত ৭১ রান করার পাশাপাশি নিয়েছিলেন তিন উইকেট। মিচেল স্টার্ক ও মাইকেল নেসার নিয়েছিলেন পাঁচটি করে উইকেট। ফলে শেষ ম্যাচে হেড পূর্ণ নম্বর পেয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সাফল্যে হেড, ক্যারি, স্টার্ক ও স্মিথ—চারজনেরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তবে হেড অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছেন টেস্টে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার পাশাপাশি এক দিনের দলেও সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটার হওয়ায়।
২০২৫-২৬ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আগস্টে ম্যাকে অনুষ্ঠিত এক দিনের ম্যাচে মাত্র ৮৩ বলে ১৪২ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন হেড। সেটি ছিল ওই সময়ের মধ্যে তার চতুর্থ শতক। এর আগে পার্থ টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শেষ দিকে চতুর্থ ইনিংসে ১২৩ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন তিনি। এরপর অ্যাডিলেডে ১৭০ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে অ্যাশেজ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন।
একাধিকবার অ্যালান বোর্ডার পদক জেতা সতীর্থ স্টিভ স্মিথ ও নাথান লায়নের তালিকায় এবার যুক্ত হলেন হেড। স্মিথ ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চারবার এই পুরস্কার জিতেছেন। লায়ন জিতেছেন ২০১৯ ও ২০২৪ সালে।
টানা দুইবার অ্যালান বোর্ডার পদক জেতা ক্রিকেটারদের মধ্যে রয়েছেন রিকি পন্টিং, মাইকেল ক্লার্ক, শেন ওয়াটসন, ডেভিড ওয়ার্নার এবং এবার ট্রাভিস হেড।
টানা দুইবার অ্যালান বোর্ডার পদকজয়ী:
ট্রাভিস হেড — ২০২৫, ২০২৬
ডেভিড ওয়ার্নার — ২০১৬, ২০১৭
মাইকেল ক্লার্ক — ২০১২, ২০১৩
শেন ওয়াটসন — ২০১০, ২০১১
রিকি পন্টিং — ২০০৬, ২০০৭
পুরস্কার পাওয়ার পর হেড বলেন, ‘অ্যালান বোর্ডার নিজে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন, এটা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। গত বছর শ্রীলঙ্কায় পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে এবারের অভিজ্ঞতাটা আলাদা, কারণ এবার অ্যালান বোর্ডার নিজেই এখানে ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুটি পদক হয়েছে। ২০ বছর পর আমার সন্তানদের এগুলো দেখিয়ে এই সময়ের গল্প বলতে পারব, ভাবতেই ভালো লাগছে।’
হেড বলেন, ‘এই দুটি পুরস্কারের সঙ্গে ভারত ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, এটাও দারুণ। অ্যাশেজ জেতা অসাধারণ ব্যাপার। সামনে দেশের বাইরে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি জেতার সুযোগ, দেশের বাইরে অ্যাশেজ জেতার সুযোগ এবং আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় এক দিনের বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ রয়েছে। আপাতত এসব নিয়েই আমার পুরো মনোযোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশের বিপক্ষে আমাদের ভালো খেলতে হবে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বড় সুযোগ আছে। তারপর নিউজিল্যান্ডে যেতে হবে, যারা অসাধারণ ক্রিকেট খেলছে। আমাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। আমি শুধু খুশি যে ভালো খেলছি। আশা করি এই ধারাটা ধরে রাখতে পারব।’
টেস্টে বর্ষসেরা মিচেল স্টার্ক
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১১টি টেস্টে মিচেল স্টার্কের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই মানের বোলিং করার ক্ষমতার স্বীকৃতি মিলেছে শেন ওয়ার্ন বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কারে।
জ্যামাইকায় গোলাপি ডিউক বল দিয়ে মাত্র ৯ রানে ৬ উইকেট নেওয়া এবং অ্যাশেজে ৩১ উইকেট শিকার ছিল তার সেরা পারফরম্যান্সগুলোর মধ্যে অন্যতম।
শেন ওয়ার্ন বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের ভোটে স্টার্ক পেয়েছেন ২৫ ভোট। হেড পেয়েছেন ২১, ক্যারি ২০, স্মিথ ১৩ এবং মাইকেল নেসার ১০ ভোট।
নয় বছর পর আবার এই পুরস্কার জিতলেন স্টার্ক। ব্যক্তিগত সংস্করণভিত্তিক পুরস্কার জেতার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে দীর্ঘ ব্যবধান।
ভোটের সময়কালে ১৮.১২ গড়ে ৫৭টি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন স্টার্ক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি নাথান লায়নের উইকেট ছিল ২৮টি, গড় ২৫.৫৩। ফলে স্টার্কের উইকেটসংখ্যা ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি।
টানা তৃতীয়বার কোনো বোলার এই পুরস্কার জিতলেন। ২০২৪ সালে লায়ন এবং ২০২৫ সালে জশ হ্যাজেলউডের পর এবার পুরস্কার উঠল স্টার্কের হাতে।
টি-টোয়েন্টিতে বর্ষসেরা টিম ডেভিড
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের অন্যতম নায়ক টিম ডেভিড প্রথমবারের মতো বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন।
টি-টোয়েন্টিতে ভোটের হিসাবে ডেভিড পেয়েছেন ২৩ ভোট। মিচেল মার্শ ১৯, নাথান এলিস ১৭, বেন ডোয়ারশিস ১৬ এবং জশ হ্যাজেলউড ১৬ ভোট পেয়েছেন।
ব্যাটিংয়ের চার ও পাঁচ নম্বরে উঠে এসে ডেভিড ৪৯.৩৭ গড়ে রান করেছেন। তার ব্যাটিংয়ের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯৭.৫০। শক্তিশালী ব্যাটিং পারফরম্যান্সে তিনি মার্শকেও পেছনে ফেলেছেন। মার্শ ৩৭.৮৩ গড়ে ৪৫৪ রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫৮।
ভোটের সময়কালে পূর্ণ সদস্য দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টিতে পাঁচটির বেশি ইনিংস খেলা কোনো ব্যাটার ডেভিডের চেয়ে দ্রুত রান করতে পারেননি। সেন্ট কিটসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ৩৭ বলে শতক করেছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে সেটিই ছিল তার প্রথম শতক।
ব্যাট হাতে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বোলার নাথান এলিস ও অ্যাডাম জাম্পারও দারুণ সময় কেটেছে। ভোটের সময়কালে এলিস ১৮টি এবং জাম্পা ১৭টি উইকেট নিয়েছেন।
ওয়ানডে ক্রিকেটে বর্ষসেরা মিচেল মার্শ
এক দিনের ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের মতো বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন মিচেল মার্শ। তিন বছরের মধ্যে এটি তার দ্বিতীয় এই পুরস্কার।
ভোটে মার্শ পেয়েছেন ১৬ ভোট। জশ ইংলিস ১২, নাথান এলিস ১১, অ্যালেক্স ক্যারি ১০ এবং ট্রাভিস হেড ৯ ভোট পেয়েছেন।
ভোটের জন্য বিবেচিত ১০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে খেলেছিলেন মার্শ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিঠের সমস্যার কারণে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে পারেননি তিনি। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের বিপক্ষে দেশের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে ফিরে এসে ৬০-এর বেশি গড়ে রান করেন।
আগস্টে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যথাক্রমে ৮৮ ও ১০০ রানের ইনিংস খেলেন মার্শ। এরপর অক্টোবরে পার্থে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৫২ বলে ৪৬ রান করে অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়ায় নেতৃত্ব দেন। সেই ইনিংসের পরই এক দিনের ক্রিকেটের বর্ষসেরা পুরস্কার অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন তিনি।










































